চীনের সহায়তায় নির্মিত অত্যাধুনিক ‘পিএনএস হ্যাঙ্গর’ নামের একটি সাবমেরিন আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবহরে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে পাকিস্তান এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বার্তা দিতে চাইছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
চীনের তৈরি এই সাবমেরিনটি দেশে ফিরিয়ে আনতে নৌবাহিনীর একটি বিশেষ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কমোডর ওমর ফারুক। দেশে ফেরার পথে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে যাত্রাবিরতিকালে স্থানীয় দৈনিক ‘দ্য মর্নিং’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে আনেন।
গত ৭ জুন প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হ্যাঙ্গর-শ্রেণির এই সাবমেরিন বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের নৌ-উপস্থিতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে অভাবনীয় সক্ষমতা জোগাবে।
তিনি এই সাবমেরিনকে একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আরও জানান, খুব শিগগিরই পাকিস্তান নৌবাহিনীতে এই সিরিজের আরও সাতটি সাবমেরিন যুক্ত হতে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে আটটি অত্যাধুনিক সাবমেরিনের এই বিশাল বহর বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করবে। ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর উপস্থিতির বিষয়টি একেবারে নতুন নয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত এই জলসীমায় ‘পিএনএস হ্যাঙ্গর’ নামেরই অপর একটি সাবমেরিন মোতায়েন ছিল। সে বছর যুদ্ধের সময় ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবমেরিন ‘আইএনএস খুকরি’-কে ডুবিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন পিএনএস হ্যাঙ্গর।
তবে যুদ্ধে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর পাকিস্তান এই অঞ্চল থেকে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর কার্যক্রম মূলত উত্তর আরব সাগরেই সীমাবদ্ধ ছিল।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে বঙ্গোপসাগর ঐতিহ্যগতভাবেই ভারতের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক একটি সামুদ্রিক অঞ্চল। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নৌ-কমান্ডের সদরদপ্তর বিশাখাপত্তনমে অবস্থিত এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নৈকট্যের কারণে এই জলসীমায় ভারতের শক্ত অবস্থান রয়েছে।
পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পণ্য এবং জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিস্তৃত জলরাশির উপকূলবর্তী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কা।
বর্তমানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার মাঝে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঠিক এমন একটি প্রেক্ষাপটেই শ্রীলঙ্কায় পাকিস্তানি নৌ-কর্মকর্তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগর এককভাবে কোনো নির্দিষ্ট দেশের সম্পত্তি নয়। নিয়ম অনুযায়ী, উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ওপর নিজেদের সার্বভৌম অধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
এই সীমানার বাইরের বিশাল জলরাশি আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে যেকোনো দেশের বাণিজ্যিক এমনকি সামরিক জাহাজগুলোও আন্তর্জাতিক আইন মেনে অবাধে চলাচল করার অধিকার রাখে।