এই ঐতিহাসিক যাত্রার মধ্য দিয়ে ভারত বৈশ্বিক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সবুজ বিপ্লবের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে মূল্যায়ন করছে।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে, তা মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে এটি ভারতের একটি অত্যন্ত সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে, গত ২২ মে ভারতের রেল বিভাগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা ইন্ডিয়ান রেলওয়ে বোর্ড বা আইআরবি আনুষ্ঠানিকভাবে এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ট্রেনটিতে যাত্রী পরিবহণের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করে।
বোর্ডের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানানো হয়েছিল যে, এটি কেবল ভারতেরই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেন-চালিত ব্রডগেজ ট্রেন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে।
চূড়ান্তভাবে যাত্রী নিয়ে রেললাইনের ওপর নামার আগে ট্রেনটির একাধিক কঠোর ট্রায়াল রান বা পরীক্ষামূলক যাত্রা অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতাতেই আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রীদের নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছুটে চলবে এই অত্যাধুনিক ট্রেনটি।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে হাইড্রোজেনকে অন্যতম পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও ভবিষ্যতের প্রধান টেকসই জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবেশবান্ধব জ্বালানি বিশ্বব্যাপী পরিবহণ খাতকে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও ইতিবাচক দিশার দিকে নিয়ে যাবে।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে হাইড্রোজেনের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে এই ট্রেনটি চালিত হয়, যার ফলে সাধারণ ট্রেনের মতো এতে কোনো ধরনের বিষাক্ত কালো ধোঁয়া বা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয় না।
জ্বালানি পোড়ানোর পর উপজাত হিসেবে নির্গত হয় কেবল নিরীহ জলীয় বাষ্প। এর ফলে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ঠিক এই কারণেই বিশ্বের উন্নত ও শিল্পোন্নত দেশগুলোতে প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে হাইড্রোজেন জ্বালানি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে।
ইতিমধ্যে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান এবং চীনের মতো প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর দেশগুলোতে নিয়মিতভাবে হাইড্রোজেন-চালিত ট্রেন ও বাস চলাচল করছে। এবার সেই অভিজাত ও পরিবেশসচেতন দেশগুলোর তালিকায় অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে যুক্ত হলো ভারতের নাম।
ভারতের রেলওয়ে বোর্ড সম্পূর্ণ নিজস্ব ও দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই যুগান্তকারী প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নামকরণ করেছে 'হাইড্রোজেন ফর হেরিটেজ'। উদ্বোধনের পর প্রাথমিকভাবে এই অত্যাধুনিক ট্রেনটি ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের জিন্দ থেকে সোনিপত পর্যন্ত বিস্তৃত ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রুটে নিয়মিতভাবে চলাচল করবে।
যাত্রাপথে ট্রেনটি পান্ডু পিন্দারা জংশন, ললিত খেরা হল্ট, ভামভেওয়া, ইসাপুর খেরি হল্ট, বুটানা হল্ট, খান্দরাই হল্ট, রাবরাহ হল্ট, লাথ হল্ট, মোহানা এবং বারওয়াসনি হল্টসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে থামবে এবং যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ করে দেবে।
ভারতীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, এই রুটে ট্রেনটির চলাচল পুরোপুরি সফল হলে আগামী দিনে হরিয়ানার কালকা শহর থেকে হিমাচল প্রদেশের রাজধানী শিমলা পর্যন্ত অত্যন্ত জনপ্রিয় ও দুর্গম পাহাড়ি রুটেও এই হাইড্রোজেন-চালিত ট্রেন চালু করা হতে পারে, যা পর্যটন শিল্পেও ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
গতি ও কারিগরি সক্ষমতার দিক থেকেও এই ট্রেনটি অত্যন্ত উন্নত মানের। ভারতীয় রেল বিভাগ জানিয়েছে, এই নতুন ট্রেনের নকশাকৃত সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ২৪০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার শক্তিশালী ইঞ্জিন ব্যবহার করে ট্রেনটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭৫ কিলোমিটার বেগে ট্র্যাকের ওপর দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ছুটবে।
ট্রেনের নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের জন্য জিন্দ স্টেশনে স্থাপিত একটি আধুনিক ও বিশেষায়িত হাইড্রোজেন রিফুয়েলিং স্টেশন থেকে এই ট্রেনের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। শুধু গতি নয়, ট্রেনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নকশা এবং যাত্রী পরিষেবাতেও আধুনিকতার সর্বোচ্চ ছোঁয়া নিশ্চিত করা হয়েছে।
সম্পূর্ণ ট্রেনটিতে দুটি উন্নত প্রযুক্তির হাইড্রোজেন ড্রাইভিং পাওয়ার কার এবং আটটি অত্যাধুনিক যাত্রীবাহী কোচ যুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে একসঙ্গে প্রায় ২,৬০০ জন যাত্রী এই ট্রেনে অত্যন্ত আরামদায়ক ও নিরাপদভাবে ভ্রমণ করতে পারবেন।
ট্রেনটির কারিগরি দিকগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি পাওয়ার কারে সংযোজন করা হয়েছে উচ্চ ক্ষমতার হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল, লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারি এবং হাইড্রোজেন সংরক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও বিশেষায়িত টেকসই সিলিন্ডার।
প্রতিটি পাওয়ার কার একাই ১,২০০ কিলোওয়াট বা প্রায় ১,৬০০ হর্সপাওয়ার পরিমাণ বিপুল শক্তি উৎপাদনে সক্ষম। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি যাত্রীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার দিকটিতেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিশেষ ও আপসহীন নজর দিয়েছে।
যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে ট্রেনে স্থাপন করা হয়েছে অতি সংবেদনশীল হাইড্রোজেন লিক ডিটেক্টর এবং কোথাও আগুনের সূত্রপাত হলে তা মুহূর্তের মধ্যে শনাক্ত করার জন্য স্বয়ংক্রিয় ফ্লেম ডিটেক্টর। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ধোঁয়া ও তাপমাত্রা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
একটি সমন্বিত মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ট্রেনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের ওপর নিবিড় নজরদারি চালানো হবে, যাতে যাত্রাপথে সামান্যতম কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যা দেখা দিলেই মুহূর্তের মধ্যে তা চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ে সমাধান করা যায়।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও গৌরবের বিষয় হলো, ভারতের কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গবেষণা, উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত মান নির্ধারণী সংস্থা রিসার্চ ডিজাইন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশন বা আরডিএসও-এর নিজস্ব ও উদ্ভাবনী নকশায় এবং সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে এই ট্রেনটি নির্মাণ করা হয়েছে।
ইন্ডিয়া টুডে এবং এই সময়-এর মতো নির্ভরযোগ্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, এই ট্রেন সফলভাবে চালুর মাধ্যমে সবুজ জ্বালানি বা গ্রিন এনার্জির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কার্বন নিঃসরণ শূন্যমাত্রায় নামিয়ে আনার যে বৈশ্বিক ও জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, সেই কাঙ্ক্ষিত পথে ভারত এক বিশাল ও অবিস্মরণীয় ধাপ এগিয়ে গেল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।