শুক্রবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচিত এই প্রত্যর্পণ ইস্যু নিয়ে ভারতের সর্বশেষ এই আনুষ্ঠানিক অবস্থান দুই দেশের বহুমাত্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একটি সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ওই সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল অত্যন্ত সতর্ক, পরিমিত ও পেশাদার ভাষায় ভারতের অবস্থান বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট করেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য তারা একটি আনুষ্ঠানিক অনুরোধপত্র হাতে পেয়েছেন।
বিষয়টি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় অনুরোধটি বর্তমানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গভীরভাবে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। জয়সওয়াল বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলেন, এ ধরনের যেকোনো উচ্চপর্যায়ের প্রত্যর্পণের বিষয়ের সঙ্গে দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান চুক্তি, অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক আইনের পাশাপাশি অত্যন্ত জটিল বিচারিক প্রক্রিয়া ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে।
তাই পুরো বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামোর ভেতর রেখেই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর আগেও বিভিন্ন সময় এই বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চাওয়া হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র বারবারই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, এই ইস্যুতে তাদের মৌলিক অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং যেকোনো ব্যক্তির প্রত্যর্পণ একটি সম্পূর্ণ আইনি বিষয়, যা প্রচলিত আইন ও চুক্তির বিধিবিধান অনুযায়ীই পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তি করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত এক সাংবাদিক এ সময় অপর একটি প্রত্যর্পণ ইস্যু নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন। ওই সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি গণমাধ্যমে জানিয়েছেন যে, বিগত নির্বাচনের আগে সংঘটিত বহুল আলোচিত একটি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামিকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় সকল নথিপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং কাঙ্ক্ষিত ওই ব্যক্তি বর্তমানে ভারতীয় পুলিশের হেফাজতে আটক রয়েছেন।
এ বিষয়ে ভারতের পরবর্তী আইনি বা কূটনৈতিক পদক্ষেপ কী হতে পারে-এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল জানান, অন্য এক ব্যক্তির হত্যা মামলা সংক্রান্ত প্রত্যর্পণের এই নির্দিষ্ট অনুরোধের বিষয়ে তিনি এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে কোনো তথ্য বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানাতে পারছেন না।
তবে তিনি ওই সাংবাদিককে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আবারও সুস্পষ্টভাবে আশ্বস্ত করেন যে, যেকোনো ব্যক্তির প্রত্যর্পণের অনুরোধই কেবল আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং এক্ষেত্রে কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো বা আইনের ব্যত্যয় ঘটার সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন বাংলাদেশে টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নাটকীয় সেই দেশত্যাগের পর থেকেই তিনি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে কড়া নিরাপত্তায় একটি গোপন আশ্রয়ে অবস্থান করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ ও বিরল সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন যে, অন্যান্য পলাতক রাজনৈতিক নেতা ও দলের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে তিনি অচিরেই দেশে ফিরে আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন।
এদিকে, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে নির্মমভাবে দমনের উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগে তাকে নিজ দেশে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের সেই চাঞ্চল্যকর ও ঐতিহাসিক মামলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এরই মধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে, যা এই প্রত্যর্পণ ইস্যুকে আরও বেশি জটিল ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার এই অকল্পনীয় ও করুণ রাজনৈতিক পতনের বীজ মূলত উপ্ত হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে দেওয়া তার নিজেরই একটি চরম বিতর্কিত ও অবিমৃষ্যকারী মন্তব্যের মধ্য দিয়ে।
সে সময় সরকারি চাকরিতে মেধার মূল্যায়ন এবং বৈষম্যমূলক কোটা সংস্কারের দাবিতে দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাত্র বিক্ষোভে উত্তাল ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে পূর্বনির্ধারিত চীন সফর কিছুটা সংক্ষিপ্ত করে ওই বছরের ১১ জুলাই রাতে দেশে ফিরে আসেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী।
এর ঠিক তিন দিন পর, ১৪ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বহাল রাখার পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ওই দিন বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে চীন সফর-পরবর্তী এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল।
সেই বহুল চর্চিত সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক প্রভাষ আমিনের এক সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত লক্ষ লক্ষ সাধারণ শিক্ষার্থীকে অত্যন্ত অবমাননাকর ভাষায় পরোক্ষভাবে ‘রাজাকারের নাতি-নাতনি’ বলে আখ্যায়িত করেন।
রাষ্ট্রের শীর্ষ নির্বাহীর পর্যায় থেকে আসা এই চরম অবমাননাকর, দায়িত্বহীন ও সংবেদনশীল মন্তব্যের পরপরই শিক্ষার্থীদের অহিংস ও যৌক্তিক কোটা সংস্কার আন্দোলন মুহূর্তের মধ্যে একটি নতুন, ভয়ংকর ও তীব্র গতি লাভ করে।
দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের আত্মমর্যাদা ও দেশপ্রেমের চেতনায় মারাত্মকভাবে আঘাত হানায় এই আন্দোলন দ্রুতগতিতে রাজধানী ছাড়িয়ে গোটা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। কোটা সংস্কারের একটি নিতান্তই সাধারণ দাবিতে শুরু হওয়া সেই ছাত্র আন্দোলন অচিরেই দলমত, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এক সর্বাত্মক ও অপ্রতিরোধ্য সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়।
এই দুর্বার ও ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনেরই চূড়ান্ত ও অনিবার্য পরিণতি ঘটেছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে, যার ফলে শেখ হাসিনার দীর্ঘ দেড় দশকের একচ্ছত্র রাজনৈতিক শাসনের এক মর্মান্তিক সমাপ্তি ঘটে।
বর্তমানে তার দেশে প্রত্যাবর্তন এবং কৃতকর্মের জন্য ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হওয়ার পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ভারত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক ও আইনি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যকার ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও বিচারিক সমীকরণের ওপর নির্ভর করছে।