শুক্রবার, জুলাই ১৭, ২০২৬
২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুয়েতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির পরিধি বাড়াতে আগ্রহী পাকিস্তান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ জুলাই, ২০২৬, ০৯:৩১ পিএম

কুয়েতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির পরিধি বাড়াতে আগ্রহী পাকিস্তান
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত সমীকরণের মধ্যেই নিজেদের কৌশলগত অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে উদ্যোগী হয়েছে পাকিস্তান। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অংশ হিসেবে সরাসরি জ্বালানি সহযোগিতা এবং বিপুল অঙ্কের বিদেশি বিনিয়োগের বিনিময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র কুয়েতের সঙ্গে একটি বৃহৎ পরিসরের প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে নিবিড় আলোচনা শুরু করেছে ইসলামাবাদ।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই খবর প্রকাশ করা হয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি অত্যন্ত গোপন সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয় যে, দুই দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতার বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা চলমান রয়েছে।

 

তবে পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো একদম শুরুর ধাপে অবস্থান করছে বলে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। কৌশলগত এই আলোচনা এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এল, যখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

 

বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বৈরিতা ও সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চলে এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই চলমান সংঘাত এবং উত্তেজনার কারণে পাকিস্তান ও কুয়েতের মধ্যকার এই প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির ভবিষ্যৎ বেশ জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে।

 

কারণ, এই ধরনের কোনো সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হলে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার সম্ভাব্য সংঘাতে পাকিস্তানের জড়িয়ে পড়ার একটি প্রচ্ছন্ন ঝুঁকি থেকে যায়, যা ইসলামাবাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত অনুরূপ একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টিও বারবার সামনে আসছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক নৈকট্য বৃদ্ধির কারণে পাকিস্তান ইতিমধ্যেই মার্কিন-ইরান প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

 

এর একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় সাম্প্রতিক একটি ঘটনায়। গত সোমবার যখন ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ স্থাপনায় আকস্মিক হামলা চালায়, তখন ইসলামাবাদ অত্যন্ত দ্রুত ও কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।

 

তেহরানের উদ্দেশে দেওয়া এক কড়া ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয় যে, মিত্র রাষ্ট্র সৌদি আরবের ওপর পরিচালিত যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা হামলাকে সরাসরি পাকিস্তানের নিজস্ব ভূখণ্ডের ওপর হামলা হিসেবেই বিবেচনা করা হবে।

 

অন্যদিকে, কুয়েতের সঙ্গে যদি পাকিস্তানের নতুন করে কোনো বৃহৎ প্রতিরক্ষা চুক্তি চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো ধরনের কূটনৈতিক মধ্যস্থতার প্রয়োজন হলে, সেখানে পাকিস্তানের নিরপেক্ষ ও স্বাধীন ভূমিকা রাখা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের প্রশ্ন ও সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে।

 

কারণ, আঞ্চলিক সংঘাতের জেরে সাম্প্রতিক সময়ে কুয়েতও বিভিন্ন পক্ষের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে কুয়েত নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে এখন অনেক বেশি সতর্ক এবং সামরিক দিক থেকে নিজেদের আরও সুরক্ষিত করতে বদ্ধপরিকর।

 

উল্লেখ্য যে, পাকিস্তান এবং কুয়েতের মধ্যে সামরিক সম্পর্ক একেবারেই নতুন কোনো বিষয় নয়। গত ২০২৩ সাল থেকেই উভয় দেশের মধ্যে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান এবং যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনার জন্য একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা চুক্তি বলবৎ রয়েছে।

 

তবে বর্তমানের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় কুয়েত এই চুক্তির পরিধিকে আরও অনেক বেশি সম্প্রসারিত করতে ইচ্ছুক। পাকিস্তানের একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, কুয়েত এখন মূলত ইসলামাবাদের কাছ থেকে ঠিক সেই ধরনের একটি সার্বিক ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা কাঠামো প্রত্যাশা করছে, যেমনটা সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।

 

কুয়েতের এই সুবিশাল চাহিদাপত্রের মধ্যে স্থলে হাজার হাজার সুপ্রশিক্ষিত পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন প্রযুক্তি, আকাশপথ সুরক্ষায় ব্যবহৃত উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সব ধরনের প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত সামরিক সক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

 

তবে এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবগত পাকিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বাস্তব পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন যে, কুয়েতের চাহিদার তালিকায় কার্যত সব ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ও সহায়তার কথাই উল্লেখ রয়েছে।

 

কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে পাকিস্তান আপাতত কোনো দেশের মাটিতেই সরাসরি বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েনের মতো বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাবছে না এবং নিকট ভবিষ্যতে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার যৌক্তিক সুযোগও তাদের হাতে নেই।

 

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে যে, কুয়েত মূলত পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়সহ নানামুখী সামরিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই প্রাথমিক আলোচনাগুলো শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ, সরাসরি ও চূড়ান্ত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে রূপান্তরিত হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

 

অত্যন্ত সংবেদনশীল এই বিষয়গুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের চারটি এবং মধ্যপ্রাচ্যের একটি গোপন সূত্রের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছে। তবে বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউই নিজেদের নাম বা পদবি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে রাজি হননি।

 

একইসঙ্গে, প্রকাশিত এই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনের বিষয়ে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখা এবং কুয়েতের তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, কেউই এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের মন্তব্য বা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হয়নি। ফলস্বরূপ, এই চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, তা জানতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

 

- রয়টার্স