শুধু তাই নয়, দেশে ফিরে তিনি সরাসরি আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করার ঘোষণাও দিয়েছেন। তাঁর এই আকস্মিক ও অভাবনীয় ঘোষণার পর বাংলাদেশ এবং ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে ব্যাপক আলোড়ন ও তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে নয়াদিল্লির অভিজ্ঞ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এই ঘোষণাকে দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার পরিবর্তে, মূলত রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাচাই করার একটি সুচিন্তিত কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই বেশি বিবেচনা করছেন।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়াদিল্লির আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো আগের মতোই অপরিবর্তিত রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা গত কয়েক দিনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে নিজ উদ্যোগে ডেকে এনে আশ্রয় প্রদান করেনি এবং একই সঙ্গে তাঁকে জোরপূর্বক ভারত থেকে বিতাড়িত করার কোনো ইচ্ছাও তাদের নেই।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রস্থল সাউথ ব্লকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে মন্তব্য করেছেন যে, সার্বিক পরিস্থিতি যাচাই করে শেখ হাসিনা যদি মনে করেন তিনি দেশে ফিরবেন, তবে তিনি নির্দ্বিধায় ফিরতে পারেন। আর তিনি যদি মনে করেন যে নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতেই অবস্থান করবেন, তবে তা-ই হবে।
গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ ও দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তাঁর দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বিস্তারিত জানিয়েছেন যে, আগামী ডিসেম্বরে দলের হাজারো নেতা-কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাংলাদেশে ফিরতে চান এবং দেশে ফিরে যেকোনো আইনি ও বিচার প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হতে তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত রয়েছেন।
দেশে ফিরলে তাঁকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হতে পারে এবং এমনকি বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হতে পারে-এমন চরম পরিণতির কথা জেনেও তিনি দেশে ফেরার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে ওই সাক্ষাৎকারে সাহসিকতার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন।
শেখ হাসিনার এই স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর বক্তব্য নিয়ে নয়াদিল্লির শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা, প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাবেক কূটনীতিক এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে।
প্রথমত, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরেই যে নিশ্চিতভাবে ঢাকা ফিরবেন, এমনটা এখনই জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। আগামী পাঁচ মাসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ঠিক কোন দিকে মোড় নেয়, বর্তমান প্রশাসন কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাঁর প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে কী মনোভাব পোষণ করে, তার ওপরই মূলত এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা এই সিদ্ধান্ত হয়তো কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে সরাসরি বসে পরামর্শ করে নেননি, তবে ভারতের প্রচ্ছন্ন ও নীরব সম্মতি ছাড়া তিনি এ ধরনের বড় কোনো রাজনৈতিক ঘোষণা জনসমক্ষে দিতেন না বলে পর্যবেক্ষকরা একমত পোষণ করেছেন।
ভারত সরকারও সতর্কতার সঙ্গে হিসাব কষছে যে, শেখ হাসিনার এই ঘোষণায় তাদের নিজেদের কোনো ক্ষতি নেই, বরং এতে ভারতের জন্য একটি কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। শেখ হাসিনা যদি সফলভাবে দেশে ফিরে যান, তবে ভারত দীর্ঘ দুই বছরের একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক চাপ ও অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাবে।
আর যদি তিনি কোনো কারণে ফিরতে ব্যর্থ হন, তাহলেও নয়াদিল্লি আন্তর্জাতিক মহলকে খুব সহজেই বলতে পারবে যে, শেখ হাসিনা তো নিজ দেশেই ফিরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসন তাঁর জন্য ন্যূনতম অনুকূল পরিবেশ ও নিরাপত্তা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই সামগ্রিক কৌশলকে বিশ্লেষকরা এক পদক্ষেপে বহুমুখী রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন, যার মাধ্যমে ভারত মূলত বলটি অত্যন্ত সুকৌশলে বাংলাদেশ সরকারের কোর্টে ঠেলে দিয়েছে।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, শেখ হাসিনা তাঁর দেশে ফেরার বিষয়ে সত্যিই অত্যন্ত আন্তরিক। কারণ, একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা রক্ষা করতে হলে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি।
তিনি উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনা ঢাকায় ফিরলে বিচারিক রায়ে কোনো সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ডের আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন এবং দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন তাঁকে নিরাপদ হেফাজতে রাখা হতে পারে।
এই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পর্দার আড়ালে নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে কোনো ধরনের গোপন কূটনৈতিক দরকষাকষি হলে সেটি মোটেও অবাক করার মতো কোনো বিষয় হবে না।
অন্যদিকে, নয়াদিল্লির প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক জয়ন্ত রায়চৌধুরীর মতে, শেখ হাসিনা মূলত এই কঠোর বার্তার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বোঝাতে চাইছেন যে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করার যে চেষ্টা চলছে, তা তিনি নিজে সশরীরে উপস্থিত থেকে রাজনৈতিকভাবে রুখে দেবেন।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসের ব্যাপক পটপরিবর্তনের পর থেকে জীবন বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নেওয়া কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর মধ্যে দলীয় প্রধানের এই ঘোষণা নিয়ে মিশ্র ও দ্বিধাগ্রস্ত প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা মনে করছেন, বর্তমানের চরম বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসুন, তা বর্তমান সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরলে ঠিক কতজন নেতা-কর্মী তাঁর সঙ্গে একই বিমানে ফিরতে সাহস করবেন, তা নিয়েও দলের ভেতরে যথেষ্ট সংশয় ও ভীতি রয়েছে। কেউ কেউ নেত্রীর সঙ্গে দেশে ফেরার বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলেও সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ভয় কাজ করছে।
সাবেক এক মন্ত্রিপরিষদ সদস্য অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে জানান যে, শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়ার দিকে সারা বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কড়া নজর থাকবে, কিন্তু সাধারণ নেতা-কর্মীরা দেশে ফিরলে তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে চলে যাবেন, যার খবর হয়তো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সেভাবে কোনো গুরুত্ব পাবে না। ফলে চূড়ান্ত মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঠিক কতজন নেতা-কর্মী তাঁর সঙ্গী হবেন, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা অত্যন্ত মুশকিল।