গত শুক্রবার পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষিত নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম এক লাফে ৩১ দশমিক ০৫ রুপি এবং পেট্রোলের দাম ৫ দশমিক ৪৪ রুপি বাড়ানো হয়েছে।
সরকারের এই নতুন মূল্য নির্ধারণের ফলে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষকে এখন প্রতি লিটার ডিজেল কিনতে হবে ৩৪৫ দশমিক ৩৫ রুপিতে এবং প্রতি লিটার পেট্রোলের জন্য গুনতে হবে ৩১৬ দশমিক ১৫ রুপি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমনিতেই চরম মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিকদের ওপর জ্বালানি তেলের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি এক নতুন ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক চাপের সৃষ্টি করবে।
জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করতে এবং জনমনে তৈরি হওয়া ক্ষোভ প্রশমিত করতে দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদে একটি বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সেখানে পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, চলমান উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক ধরনের চরম অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
উদ্ভূত এই জটিল পরিস্থিতিতে দেশটির তেল ও গ্যাস নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিয়মিতভাবে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের কাজ চালিয়ে যাবে এবং সরকার পুরো পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করে আরও উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্তমান বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে এবং পরিশোধিত ডিজেলের দাম বেড়ে প্রায় ১৪০ ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেহেতু পাকিস্তান তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় নব্বই শতাংশই বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে থাকে, সেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিতিশীলতা ও মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যক্ষ প্রভাব দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়াটা সম্পূর্ণ অবধারিত।
তবে সাধারণ মানুষকে এই কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে কিছুটা স্বস্তি দিতে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় সীমার মধ্যে রাখতে সরকার বেশ কিছু কল্যাণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক জানান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সাধারণ জনগণের ভোগান্তি লাঘবের উদ্দেশ্যে ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে ১৩০ বিলিয়ন রুপি বিশেষ অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন। দেশের এই কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক সময়ে চরম ধৈর্য ধারণ করার জন্য তিনি সাধারণ জনগণকে সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
একই সঙ্গে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, দেশের নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক মানুষের জন্য সরকারের লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে, যাতে মূল্যবৃদ্ধির এই প্রবল ধাক্কা কিছুটা হলেও সামলানো সম্ভব হয়।
সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারারও উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে পাকিস্তান কোনোভাবেই তার প্রভাব থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে পারে না, এটি একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা।
তবে এই বৈশ্বিক সংকটের সুযোগ নিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে কোনো অসাধু চক্র যেন কোনো ধরনের অতিরিক্ত মুনাফা লুটতে না পারে বা অবৈধ মজুতদারির মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে বর্তমান প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থানে রয়েছে।
ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত মুনাফালোভীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে বলে তিনি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন। তথ্যমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই জাতীয় সংকটকালে কাউকেই অন্যায্য লাভের সুযোগ দেওয়া হবে না।
বিভিন্ন মহলের অভিযোগের জবাবে তিনি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে উল্লেখ করেন যে, তেল বিপণন কোম্পানিগুলো কোনোভাবেই নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করছে না এবং সরকার তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর কড়া নজরদারি রাখছে।
জ্বালানি সংকটের এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়েও সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, জ্বালানি তেলের ওপর মাত্রাতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা কমাতে এবং পরিবেশের সুরক্ষায় ভবিষ্যতে পাকিস্তানকে দ্রুত বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।
সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি করের বোঝা কমানোর একটি অন্যতম পদক্ষেপ হিসেবে এবার পেট্রোলিয়াম শুল্ক নতুন করে বাড়ানো হয়নি বলে তিনি স্বস্তির কথা জানান। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতির মূল চাকা সচল রাখতে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য গণপরিবহন, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের প্রধান বাহন মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী এবং দেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা কৃষি খাতের জন্য সরকারের দেওয়া ভর্তুকি অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আত্তাউল্লাহ তারার অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, বর্তমান এই তীব্র বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও পাকিস্তানে একদিনের জন্যও জ্বালানির কোনো ঘাটতি বা হাহাকার দেখা দেয়নি।
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যখন সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে, তখন দেশের অভ্যন্তরে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার সব ধরনের প্রয়োজনীয়, সময়োপযোগী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।