শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে আতশবাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ৮

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬, ০৭:১১ পিএম

ভারতে আতশবাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ৮
ছবি : Collected

ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের আহমেদাবাদ শহরে একটি অবৈধ আতশবাজি কারখানায় এক ভয়াবহ ও প্রলয়ঙ্কারী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক এই বিস্ফোরণে অন্তত আটজন নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে এবং আরও অন্তত নয়জন মারাত্মকভাবে দগ্ধ ও গুরুতর আহত হয়েছেন।

 

শনিবার, ১৮ জুলাই বিকেলে ঘটা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীদের মতে, হতাহতের সংখ্যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বাড়তে পারে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, কারণ আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।

 

অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং ব্যস্ত একটি শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এমন একটি বিপজ্জনক স্থাপনায় প্রাণঘাতী এই ঘটনা জনমনে তীব্র আতঙ্ক, হতাশা ও ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। প্রাথমিক পুলিশি অনুসন্ধানে জানা গেছে, আহমেদাবাদ শহরের বিস্তীর্ণ ভাস্ত্রাল এলাকায় অবস্থিত ওই দুর্ঘটনাকবলিত কারখানাটির নাম ছিল ‘ট্যালেন্ট ফায়ারওয়ার্কস’।

 

অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সুরক্ষাজনিত মারাত্মক ত্রুটি, অপর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং সরকারি নিয়মনীতি চরমভাবে লঙ্ঘনের কারণে বেশ কিছুদিন আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই কারখানাটির বৈধ লাইসেন্স বা পরিচালনার অনুমতিপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে দিয়েছিল।

 

তা সত্ত্বেও, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে এবং সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে স্থানীয় একটি নির্জন খামারের আড়ালে কারখানাটির কার্যক্রম অত্যন্ত গোপনে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। অনুমোদনহীন ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বিপুল পরিমাণ দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ এবং মারাত্মক বিস্ফোরক মজুত রাখার কারণেই মূলত এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

 

নিয়মবহির্ভূতভাবে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড কীভাবে প্রশাসনের অগোচরে চলছিল, তা নিয়েও এরই মধ্যে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেল আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে তারা প্রথম এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের জরুরি খবর পান।

 

খবর পাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফায়ার সার্ভিসের একাধিক অগ্নিনির্বাপক দল এবং ভারতের বিশেষায়িত পুলিশ বাহিনী র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং সমন্বিতভাবে এক শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।

 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে কারখানার টিনের চাল, দেয়াল ও ভারী যন্ত্রাংশ বহু দূরে ছিটকে পড়ে এবং চারপাশ ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। উদ্ধারকর্মীরা চরম সাহসিকতার সঙ্গে জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে হতাহতদের উদ্ধার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য মণিনগরের স্বনামধন্য সিভিল হাসপাতাল এবং নিকটস্থ এলজি হাসপাতালে প্রেরণ করেন।

 

বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি বিশেষ মেডিকেল বোর্ড আহতদের জীবন বাঁচাতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এই মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনায় সমগ্র ভারতজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

 

দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং হতাহতদের পরিবারের পাশে থাকার দৃঢ় আশ্বাস দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুজরাটের আহমেদাবাদে একটি আতশবাজি কারখানায় ভয়াবহ দুর্ঘটনার ফলে যে মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে, সেই খবর শুনে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত ও গভীরভাবে ব্যথিত।

 

শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি তিনি তার অকৃত্রিম ও গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন এবং একই সঙ্গে যারা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তাদের দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা কামনা করেছেন।

 

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থিক ও মানসিক সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ ক্ষতিপূরণের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, স্থানীয় জেলা ও রাজ্য প্রশাসন এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সম্ভাব্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রদান করছে।

 

পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল (পিএমএনআরএফ) থেকে নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবারকে এককালীন দুই লাখ রুপি করে আর্থিক অনুদান বা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে।

 

এছাড়া, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় যারা গুরুতর আহত হয়েছেন, তাদের চিকিৎসার বিপুল ব্যয়ভার লাঘব করার উদ্দেশ্যে প্রত্যেককে পঞ্চাশ হাজার রুপি করে আর্থিক সহায়তা প্রদানের কথাও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।

 

লাইসেন্সবিহীন ও বেআইনি কারখানায় এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ভারতের শিল্প নিরাপত্তা, শ্রমিকদের জীবনের অধিকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে এক গভীর ও উদ্বেগজনক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

- এনডিটিভি