বুধবার, জুলাই ২২, ২০২৬
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘নিজেদের সন্তান হলেও কি এমন করতেন?’ দিল্লির রাজপথে পুলিশের কাছে তরুণীর আকুতি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬, ০৫:০১ পিএম

‘নিজেদের সন্তান হলেও কি এমন করতেন?’ দিল্লির রাজপথে পুলিশের কাছে তরুণীর আকুতি
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথ আবারও এক অভূতপূর্ব ছাত্র বিক্ষোভ এবং পুলিশের কঠোর দমন-পীড়নের সাক্ষী হলো। দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা সর্বভারতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা বা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অত্যন্ত গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছিলেন হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী।

 

আর সেই জনসমুদ্রের মাঝেই জন্ম নিয়েছে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের, যা আধুনিক যোগাযোগমাধ্যমের সুবাদে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বজুড়ে। কাঁদানে গ্যাস আর বেধড়ক লাঠিচার্জের এক ভীতিকর ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে এক তরুণী বিক্ষোভকারী পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত জোড় করে যে আর্তনাদ করেছেন, তা সমগ্র দেশের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতেও দিল্লির এই উত্তাল পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসছে, যেখানে তরুণ প্রজন্মের হতাশা, ক্ষোভ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতার এক মর্মান্তিক চিত্র স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

 

ঘটনার সূত্রপাত গত সোমবার, যখন নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর চত্বর থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা সংসদ ভবন অভিমুখে এক বিশাল পদযাত্রার ডাক দিয়েছিল সামাজিক মাধ্যম ভিত্তিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।

 

‘চলো সংসদ’ নামক এই প্রতিবাদ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত পদত্যাগ এবং দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় চলমান ভয়াবহ দুর্নীতির স্থায়ী অবসান ঘটানো। আয়োজকদের এই যৌক্তিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেদিন যন্তর মন্তর এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন প্রায় দশ হাজারেরও বেশি অধিকারবঞ্চিত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।

 

শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া এই জমায়েত যখন একটি সুশৃঙ্খল মিছিলের রূপ নিয়ে সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে, ঠিক তখনই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত কঠোরভাবে তাদের ওপর চড়াও হন।

 

নিরস্ত্র ও নিরীহ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ নির্বিচারে লাঠিচার্জ শুরু করে এবং মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশের এই আকস্মিক, অপ্রস্তুত ও বেধড়ক লাঠিচার্জের ফলে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন, গুরুতর আহত হন অনেকেই এবং পুরো এলাকায় মুহূর্তের মধ্যে এক চরম বিশৃঙ্খল ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

 

ঠিক এমন এক দমবন্ধ করা এবং ভীতিকর মুহূর্তেই অন্তর্জালে ভাইরাল হওয়া সেই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আবেগঘন ঘটনাটি ঘটে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা যায়, চারিদিকে যখন পুলিশের লাঠির নির্দয় আঘাত আর বিক্ষোভকারীদের বাঁচার আর্তনাদ চলছে, তখন ভিড়ের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক তরুণী অঝোরে কাঁদছেন।

 

তিনি অত্যন্ত অসহায় ও বিপর্যস্ত অবস্থায় এক নারী পুলিশ কর্মকর্তার সামনে নিজের দুই হাত জোড় করে পরম আকুতি নিয়ে বলতে থাকেন, “ম্যাম, আপনাদের সন্তান যদি আজ এখানে আমাদের জায়গায় থাকত, তা হলেও কি আপনারা ঠিক এমনটাই করতেন?

 

এ ভাবে তাদের নির্দয়ভাবে লাঠিপেটা করতে পারতেন? আমরাও তো আপনাদেরই সন্তানের মতো।” তরুণীর দুই চোখে তখন কেবলই জল আর কণ্ঠে ছিল এক বুক চাপা কষ্ট ও চরম হতাশা। তিনি বারবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যে, নিজেদের মেধার মূল্যায়ন এবং ন্যায্য অধিকার আদায়ের এই অহিংস আন্দোলনে কোনো ধরনের সংঘাত বা পুলিশি বর্বরতা তাদের একেবারেই কাম্য নয়।

 

তরুণীর এমন হৃদয়স্পর্শী আকুতিতে আশপাশের কোলাহল যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সেখানে উপস্থিত অন্যান্য লোকজন এবং দায়িত্বরত বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য মিলে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং অতি সাবধানে উন্মত্ত ভিড়ের ভেতর থেকে তাকে একটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।

 

অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মর্মস্পর্শী এই ভিডিওটি ‘সৌরভ’ নামের একটি এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথম ইন্টারনেটে প্রকাশ করা হয়। প্রকাশের পর থেকেই ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে একেবারে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং লাখ লাখ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।

 

সাধারণ নাগরিকরা এই দৃশ্য দেখে যেমন গভীর বিস্ময় ও বেদনায় হতবাক হয়েছেন, তেমনি অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের এমন অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণের তীব্র নিন্দাও জানিয়েছেন। ভিডিওটির নিচে জমা হওয়া হাজার হাজার মন্তব্যে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও সহানুভূতির সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে।

 

একজন সচেতন নাগরিক ওই তরুণীর মানসিক অবস্থা মূল্যায়ন করে মন্তব্য বক্সে লিখেছেন, “এই তরুণীর চোখ এবং কথার পরতে পরতে এক গভীর ও অব্যক্ত বেদনা লুকিয়ে রয়েছে, যা যেকোনো সুস্থ বিবেকবান মানুষকে কাঁদাতে বাধ্য।”

 

অন্য আরেকজন ক্ষুব্ধ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী পুলিশের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে লিখেছেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এতটা নির্মম ও হৃদয়হীন হওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। এই মেধাবী শিক্ষার্থীরাই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তাদের হাসিখুশি থাকতে দিন, এভাবে পথে নামিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে কাঁদাবেন না।”

 

দিল্লির বুকে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক বা ছাত্র বিক্ষোভের চিত্র নয়, বরং এটি ভারতের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরম অনাস্থা এবং সেই যৌক্তিক ক্ষোভ দমনে রাষ্ট্রের কঠোর ও আপসহীন নীতির এক জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবেই জাতীয় ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে।