তবে সরকারের এই আপসের প্রস্তাবে সাড়া দিতে গিয়ে অত্যন্ত কড়া শর্ত জুড়ে দিয়েছেন আন্দোলনকারী সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) শীর্ষ নেতারা। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে আন্দোলনকারীদের কাছে প্রতিনিধিদল পাঠানোর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানানো হলেও, বিক্ষোভকারীরা সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের অনড় ও আপসহীন অবস্থানের কথা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সার্বক্ষণিক নজর এখন দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর চত্বরের দিকে, যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও অধিকারকামী সাধারণ মানুষ তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে গত কয়েক দিন ধরে অবিরাম ও ক্লান্তিহীন অবস্থান কর্মসূচি পালন করে চলেছেন।
এই উত্তাল ও থমথমে পরিস্থিতির মাঝেই রাষ্ট্রযন্ত্র ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে শুরু হয়েছে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধ, যা গোটা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে।
সিজেপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ ছাত্রনেতা অভিজিৎ দিপকে কেন্দ্রীয় সরকারের এই আকস্মিক আলোচনার প্রস্তাবের জবাবে অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিজেদের শর্তগুলো গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেছেন।
গত বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে এক অনির্ধারিত আলাপকালে তিনি অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে জানান যে, সরকার যদি সত্যিই এই গভীর জাতীয় সংকটের একটি টেকসই সমাধান চায় এবং কোনো ফলপ্রসূ আলোচনায় বসতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী হয়, তবে সরকারি প্রতিনিধিদেরই স্বয়ং যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থিত হতে হবে।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, সাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো অবস্থাতেই আপস করা হবে না এবং সরকারের উচিত কালক্ষেপণ না করে তাদের সমস্ত যৌক্তিক শর্ত অবিলম্বে মেনে নেওয়া। রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষপদস্থ কর্তাব্যক্তিদের অহমিকা ও ক্ষমতার দম্ভ চিরতরে বন্ধ হওয়া উচিত বলে তিনি কঠোর মন্তব্য করেন।
তার এই আপসহীন ও দৃঢ় অবস্থান আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে নতুন করে অভাবনীয় উন্মাদনা ও সাহসের সঞ্চার করেছে, যা এই চলমান গণআন্দোলনকে আরও বেশি অপ্রতিরোধ্য ও বেগবান করে তুলেছে।
অন্যদিকে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক নির্ভরযোগ্য ও উচ্চপদস্থ সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে যে, কেন্দ্রীয় সরকারের একটি বিশেষ নীতিনির্ধারক মহল রাজপথের এই উত্তাল পরিস্থিতি শান্ত করতে অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে বসতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
তবে তাদের একটি প্রধান শর্ত হলো, আন্দোলনকারীদের একটি সুনির্দিষ্ট ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদলকে সরকারি দপ্তরে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে হবে। ঠিক এমন এক জটিল, পরস্পরবিরোধী ও টানাপোড়েনমূলক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সিজেপির অন্যতম মুখপাত্র আষুতোশ রাঙ্কা কিছুটা নমনীয়তা ও প্রশংসনীয় কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।
তিনি আলোচনার পথ একেবারে বন্ধ না করে দিয়ে একটি কার্যকর বিকল্প প্রস্তাব পেশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, সরকার চাইলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ কোনো স্থানে অথবা সরাসরি যন্তর মন্তরেই এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে।
তবে তিনি এ কথাও অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, আলোচনার স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে তারা কিছুটা ছাড় দিলেও নিজেদের মূল ও অবিসংবাদিত দাবি থেকে এক চুলও সরে দাঁড়াবেন না।
তাদের প্রথম ও চূড়ান্ত দাবি হলো, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই বিশাল ও নজিরবিহীন দুর্নীতির নৈতিক দায়ভার সম্পূর্ণভাবে কাঁধে নিয়ে বর্তমান কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে অবিলম্বে তার পদ থেকে নিঃশর্ত পদত্যাগ করতে হবে।
সরকারের সদিচ্ছার প্রতি আন্দোলনকারীদের এই চরম অনাস্থা ও গভীর অবিশ্বাসের পেছনে গত সোমবার ঘটে যাওয়া এক ন্যক্কারজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে।
তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে অভিযোগ করে বলেন যে, গত সোমবার আলোচনার নামে তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে চরম মাত্রায় প্রতারণা করা হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে একটি পূর্বনির্ধারিত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসার জন্য সিজেপির দুজন শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিকে সেদিন সরকারি কার্যালয়ে ডেকে পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপ ও বিস্ময়ের বিষয় হলো, সেই সম্মানজনক আলোচনার টেবিলে বসার ঠিক পরপরই ওই দুই প্রতিনিধির ব্যক্তিগত মুঠোফোন জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং তাদেরকে একটি কক্ষে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে বা গৃহবন্দি করে রাখা হয়।
ঠিক সেই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও নিরীহ বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অতর্কিত ও বর্বরোচিত হামলা চালায়।
সেই সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে বেধড়ক লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। প্রশাসনের এমন অগণতান্ত্রিক ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণের কারণেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ এবং তারা এখন আর কোনোভাবেই সরকারি দপ্তরে গিয়ে রুদ্ধদ্বার আলোচনায় বসতে বিন্দুমাত্র রাজি নন।
সর্বভারতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যখন চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন, ঠিক তখনই সিজেপির এই আপসহীন আন্দোলন সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার আলো জাগিয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে নামা তরুণ সমাজ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ, পুলিশি নিপীড়ন বা প্রতারণা তাদের এই ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে স্তব্ধ করতে পারবে না।
সরকার ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যকার এই অচলাবস্থা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায় এবং শিক্ষার্থীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত বিচার পায় কি না, তা দেখার জন্য পুরো দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করছে।