ঠিক এমন এক উত্তাল ও সংকটময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা এবং কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব রাহুল গান্ধী ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত পদত্যাগ দাবি করেছেন।
তিনি শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অযোগ্যতার অভিযোগ তুলে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিক্ষোভরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানাতে গিয়ে গতকাল মঙ্গলবার যন্তর মন্তর এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আকস্মিকভাবে আটক হয়েছিলেন রাহুল গান্ধী।
আজ বুধবার পুলিশি হেফাজত থেকে মুক্তি পাওয়ার পরপরই তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেই আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি চলমান এই নজিরবিহীন গণআন্দোলন এবং সরকারের চরম উদাসীনতা নিয়ে খোলামেলা ও বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সাংবাদিকদের সামনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “রাস্তায় আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অনতিবিলম্বে পদত্যাগ চাইছেন। দেশের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এই মুহূর্তে তাকে তার দায়িত্ব থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেওয়া উচিত।
ভারতের মতো একটি বিশাল গণতান্ত্রিক দেশের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য তিনি একজন সম্পূর্ণ অক্ষম ও অযোগ্য ব্যক্তি।” সর্বভারতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ভারতের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামক একটি উদীয়মান রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে সংগঠিত হয়ে তারা এই দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন শুরু করেছেন। রাজপথে নামা হাজার হাজার শিক্ষার্থীরও প্রধান ও একমাত্র দাবি হলো বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
রাহুল গান্ধী তার বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক দাবির সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই সাম্প্রতিক ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ।
কংগ্রেসের এই শীর্ষ নেতা তার সংবাদ সম্মেলনে কিছু অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে দাবি করেন যে, গত এক যুগে ভারতে অন্তত ১৫২ বার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
পরিসংখ্যানগত দিক থেকে নিখুঁতভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে গড়ে অন্তত একবার করে এমন ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এই অব্যাহত ও লাগামহীন দুর্নীতির কারণে দেশের প্রায় সাড়ে সাত কোটি শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
রাহুল গান্ধী গভীর উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেন, “এই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বেশিরভাগই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির। তারা তাদের সারা জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের সবটুকু অর্থ সন্তানদের পড়াশোনা ও এসব পরীক্ষার প্রস্তুতির পেছনে ব্যয় করেছেন।
অথচ দুর্নীতিগ্রস্ত এই বিচারহীন ব্যবস্থার কারণে আজ তারাই সবচেয়ে বেশি আর্থিকভাবে ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন।” বিরোধীদলীয় এই নেতা সবচেয়ে বেশি বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেছেন প্রশাসনের জবাবদিহিতার সম্পূর্ণ অভাব নিয়ে।
তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, “সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, গত দশ বছরে ১৫২ বার প্রশ্ন ফাঁসের মতো এত বড় বড় ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও এর দায়ে কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী বা আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। জবাবদিহিতা বা শাস্তির হার এখানে আক্ষরিক অর্থেই শূন্য।”
ভারতের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি পুরোপুরি ‘পাতানো ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ ব্যবস্থায় পরিণত করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, “আজকের তরুণ শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করছে যে, তারা একটি সম্পূর্ণ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা পাওয়ার অধিকার রাখে।
অথচ এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী চরম হতাশা থেকে আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পথ বেছে নিয়েছে। তারা বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে এবং শেষ মুহূর্তে পরীক্ষার হলে বসার ঠিক আগমুহূর্তে তাদের জানানো হয়েছে যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে।
এটি আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গভীর ও উদ্বেগজনক এক জাতীয় সংকট।” পরিশেষে তিনি বলেন, “সবার কাছে আজ এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, আমাদের যে শিক্ষাব্যবস্থা এক সময় সমগ্র বিশ্বের কাছে অন্যতম সেরা হিসেবে বিবেচিত হতো, তা এখন কেবলই একটি পাতানো এবং অকার্যকর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।”
দিল্লির রাজপথে চলমান এই বিক্ষোভ কেবল আর সাধারণ কোনো ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বৃহত্তর দুর্নীতিবিরোধী ও সরকারবিরোধী রূপ ধারণ করেছে। জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সোচ্চার অবস্থান কেন্দ্রীয় সরকারকে এক অভাবনীয় ও বহুমুখী চাপের মুখে ফেলেছে।
একদিকে বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের জন্য ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ, অন্যদিকে রাজপথে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীর অধিকার আদায়ের স্লোগান-সব মিলিয়ে ভারতের রাজধানী এখন এক চরম অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে।