পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস বা আটকের মতো কঠোর পদক্ষেপও রাজপথে নামা এই অধিকারকামী শিক্ষার্থীদের মনোবল ভাঙতে পারছে না। গত সোমবার পুলিশের ব্যাপক ধরপাকড়ের পর যেসব আন্দোলনকারীকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাদের অনেকেই মুক্তি পাওয়ার পরপরই সরাসরি পুনরায় যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থলে এসে জড়ো হচ্ছেন।
বুধবার প্রকাশিত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক বিশদ প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের এই ইস্পাতকঠিন সংকল্প ও রাজপথে ফিরে আসার খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মূল দাবি-শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং সামগ্রিক ব্যর্থতার দায়ভার কাঁধে নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত পদত্যাগ। এই দাবি আদায়ে গত কয়েক দিন ধরে যন্তর মন্তরে তারা যে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন, গত সোমবার তা পুলিশের কঠোর হস্তক্ষেপে এক রুদ্ধশ্বাস ও ভীতিকর পরিস্থিতির জন্ম দেয়।
কিন্তু আটকের চব্বিশ ঘণ্টা পার না হতেই আইনি প্রক্রিয়া শেষে মুক্তি পেয়ে এসব শিক্ষার্থী যেভাবে পুনরায় প্রতিবাদস্থলে ফিরে আসছেন, তা দেশের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিশ্লেষকদেরও বিস্মিত করেছে। এই ফিরে আসা যেন কেবলই একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেরা নয়, বরং দুর্নীতিগ্রস্ত একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তরুণ সমাজের বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর এক চূড়ান্ত বার্তা।
এই ফিরে আসার পেছনে লুকিয়ে আছে একেকটি মর্মস্পর্শী ও ক্ষোভের গল্প। এমনই একজন হলেন দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী কৃষ্ণা, যার চোখে ভবিষ্যতে একজন আদর্শ অধ্যাপক হওয়ার স্বপ্ন। গত সোমবার যন্তর মন্তর থেকে পুলিশ তাকে জোরপূর্বক আটক করে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় নিয়ে যায়।
কৃষ্ণার অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল, আটকের সময় বেশ কয়েকজন নারী পুলিশ সদস্য তার সঙ্গে অমানবিক আচরণ করেছেন এবং চুল ধরে নির্দয়ভাবে টানাহেঁচড়া করেছেন। একরাশ হতাশার সঙ্গে কৃষ্ণা গণমাধ্যমকে জানান, ছোটবেলা থেকে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে পুলিশ সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেয়।
কিন্তু সোমবারের ওই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তার সেই ধারণাকে চিরতরে ভেঙে দিয়েছে। তাকে জেলে পাঠানোর যে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, তা তাকে মানসিকভাবে আঘাত করলেও প্রতিবাদের ভাষাকে স্তব্ধ করতে পারেনি।
প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন একুশ বছর বয়সী তরুণ সমীর দোরওয়াল। তিনি স্বনামধন্য দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওপেন লার্নিংয়ের একজন শিক্ষার্থী। টলস্টয় রোড এলাকা থেকে আটকের পর তাকে পুরো রাত কাটাতে হয় মন্দির মার্গ থানায়।
কিন্তু থানা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি নিজ বাড়িতে না গিয়ে সোজা চলে আসেন যন্তর মন্তরে। পরিবারের দুশ্চিন্তা এড়াতে সমীর তার বাবা-মাকে মিথ্যা বলে জানিয়েছিলেন যে তিনি বন্ধুর বাড়িতে আছেন। পরিবার এখনো জানে না যে তাদের সন্তান পুলিশের হাতে আটক হয়েছিল।
পাঁচ হাজার টাকার বন্ডে জামিনে মুক্তি পাওয়া সমীরকে আগামী আগস্ট মাসে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজিরা দিতে হবে জেনেও তিনি পিছু হটেননি। শিক্ষাব্যবস্থার এমন চরম অবক্ষয় দেখে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, শেষ পর্যন্ত তিনি এই লড়াই চালিয়ে যাবেন।
আইপি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের বাইশ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সিদ্ধার্থের আটকের অভিজ্ঞতা ছিল বেশ ভীতিকর। একজন আইনের ছাত্র হিসেবে তিনি যখন হঠাৎ পুলিশের হাতে আটক হন, তখন সাময়িকভাবে তিনি চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন।
তবে সিদ্ধার্থ অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে, রাস্তায় পুলিশ যতটা আক্রমণাত্মক ছিল, থানায় নিয়ে যাওয়ার পর তাদের আচরণ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই ভালো ও পেশাদার ছিল। গত তিন দিন ধরে লাগাতার যন্তর মন্তরে অবস্থান করা এই তরুণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, পুলিশের হাতে আটক হওয়ার এই অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা তার ভেতরে থাকা প্রতিবাদের সংকল্পকে দুর্বল করার বদলে বরং আরও কয়েক গুণ বেশি দৃঢ় করেছে।
এই আন্দোলনে কেবল তরুণ শিক্ষার্থীরাই নয়, বরং বিভিন্ন বয়সের সাধারণ মানুষও একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। আলিগড় থেকে ছুটে আসা আটত্রিশ বছর বয়সী সীমা যাদব এবং তার ষোলো বছর বয়সী মেয়ে কৃষ্ণার গল্পটি এর এক জ্বলন্ত প্রমাণ। গত সোমবারের পুলিশি অভিযানে এই মা-মেয়েও আটক হয়েছিলেন।
সীমা যাদবের অভিযোগ, অন্তত বিশজন পুলিশ সদস্য তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে আটক করেন এবং মা-মেয়েকে একে অপরের থেকে আলাদা করে দেন। তাকে প্রায় এক কিলোমিটার পথ মাটিতে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একপর্যায়ে শারীরিক ও মানসিক ধকল সইতে না পেরে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
অচেনা শহর দিল্লিতে কোনো আত্মীয়স্বজন না থাকায় গত পাঁচ দিন ধরে তারা গুরুদুয়ার বাংলা সাহিবে আশ্রয় নিয়ে রাত কাটাচ্ছেন। চরম পুলিশি হেনস্তার শিকার হওয়ার পরও তারা বাড়ি ফিরে যাননি, বরং পুনরায় যন্তর মন্তরে ফিরে এসে ককরোচ জনতা পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় আছেন।
আন্দোলনকারীদের এই অদম্য স্পৃহা গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক নতুন মাত্রা পায়। যন্তর মন্তরে উপস্থিত হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর মধ্যে তখন উল্লাসের ঢেউ আছড়ে পড়ে, যখন ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে, সোমবার আটক হওয়া তাদের সকল সহযোদ্ধাকে পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে।
দেশের নানা প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষও এখন এই তরুণদের ডাকে সাড়া দিয়ে আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অটল থাকা এই বিক্ষোভকারীরা যেন সমগ্র রাষ্ট্রকে এটাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, ভয় দেখিয়ে বা দমন-পীড়ন চালিয়ে যৌক্তিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে কখনো স্তব্ধ করা যায় না।