ওই দিন তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবন অভিমুখে এক বিশাল ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদী পদযাত্রায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে পথিমধ্যে বাধা প্রদান করে এবং আটক করার পর দীর্ঘ সময় একটি পুলিশের বাসে অবরুদ্ধ করে রাখে।
তবে আটকের এই ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ আজ বুধবার গণমাধ্যমের সামনে এসে তিনি এমন এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক দাবি করেছেন, যা গোটা দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
রাহুল গান্ধী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছেন যে, গতকাল তাকে বাসে আটক করে রাখার সময় কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সদস্য অত্যন্ত গোপনে তার কানে কানে ফিসফিস করে বলেছেন, তিনি যেন যেকোনো মূল্যে এই মোদি সরকারের পতন ঘটান।
একজন সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে আসা এমন মন্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার এক গভীর ইঙ্গিত বহন করে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলাপকালে কংগ্রেসের এই প্রবীণ নেতা দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার চরম অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাৎক্ষণিক ও নিঃশর্ত পদত্যাগের জোর দাবি জানান। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেন, আজ রাজপথে নামা হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ চাইছেন।
দেশের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এই মুহূর্তে তাকে তার সব ধরনের সরকারি দায়িত্ব থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেওয়া উচিত। ভারতের মতো একটি বিশাল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য তিনি একজন সম্পূর্ণ অক্ষম ও অযোগ্য ব্যক্তি।
সর্বভারতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের নজিরবিহীন ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ভারতের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন। আধুনিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-এর ব্যানারে সংগঠিত হয়ে তারা এই দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলন শুরু করেছেন।
রাজপথে নামা এই হাজার হাজার শিক্ষার্থীরও প্রধান ও একমাত্র দাবি হলো বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে এই বিশাল জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। রাহুল গান্ধী তার বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক দাবির প্রতি নিজের এবং তার দলের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় চলমান এই প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্নীতির ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে রাহুল গান্ধী বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, গত এক যুগে ভারতে অন্তত ১৫২ বার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
পরিসংখ্যানগত দিক থেকে নিখুঁতভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে গড়ে অন্তত একবার করে এমন ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এই অব্যাহত ও লাগামহীন দুর্নীতির কারণে দেশের প্রায় সাড়ে সাত কোটি শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
বিরোধীদলীয় এই নেতা গভীর আক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বেশিরভাগই দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। তারা তাদের সারা জীবনের হাড়ভাঙা খাটুনির কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের সবটুকু অর্থ সন্তানদের পড়াশোনা ও এসব পরীক্ষার প্রস্তুতির পেছনে নিঃস্বার্থভাবে ব্যয় করেছেন।
তাদের আশা ছিল, মেধার ভিত্তিতে সন্তানরা সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। অথচ দুর্নীতিগ্রস্ত এই বিচারহীন ব্যবস্থার কারণে আজ তারাই সবচেয়ে বেশি আর্থিকভাবে ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন। তাদের সেই সোনালি স্বপ্নগুলো আজ নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
রাহুল গান্ধী সবচেয়ে বেশি বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেছেন প্রশাসনের চরম জবাবদিহিহীনতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, গত দশ বছরে ১৫২ বার প্রশ্ন ফাঁসের মতো এত বড় বড় ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও এর দায়ে কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি।
জবাবদিহিতা বা শাস্তির হার এখানে আক্ষরিক অর্থেই শূন্য। কোনো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে এত বড় দুর্নীতি চলতে পারে এবং কেউ কোনো শাস্তি পায় না, তা একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অশনিসংকেত।
দিল্লির রাজপথে চলমান এই বিক্ষোভ কেবল আর সাধারণ কোনো ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং রাহুল গান্ধীর এই চাঞ্চল্যকর দাবির পর এটি একটি বৃহত্তর সরকারবিরোধী রূপ ধারণ করেছে।