বুধবার, জুলাই ২২, ২০২৬
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষার্থীদের কাছে মোদিকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬, ০৮:২৩ পিএম

শিক্ষার্থীদের কাছে মোদিকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে
ছবি: সংগৃহীত

ভারতে সাম্প্রতিক মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত তীব্র আন্দোলন ও শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি দমন-পীড়নের ঘটনায় সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী।

 

বুধবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক আবেগঘন ও নজিরবিহীন সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেসের এই জ্যেষ্ঠ নেতা চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির বরাতে জানা যায়, রাজপথে বিক্ষোভরত ক্ষুব্ধ ও নির্যাতিত সাধারণ শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত প্রধান তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করেছেন তিনি।

 

দেশের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার চরম অবক্ষয় এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়ার জন্য বর্তমান ক্ষমতাসীন প্রশাসনকেই এককভাবে দায়ী করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সময় রাহুল গান্ধী জানান যে, রাজপথে অবস্থানরত ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে প্রধান তিনটি মৌলিক দাবি উত্থাপন করেছেন।

 

আন্দোলনের প্রথম ও অন্যতম প্রধান দাবিটি হলো, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সঠিক ও কার্যকরভাবে পরিচালিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে এই মুহূর্তেই তার পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে।

 

দ্বিতীয় দাবি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, যেসব প্রশাসনিক কর্তা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত নিরীহ শিক্ষার্থীদের দিকে আঙুল তুলেছেন, কিংবা যাদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ও অংশগ্রহণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা ও লাঠিচার্জ চালানো হয়েছে, তাদের প্রত্যেককে অনতিবিলম্বে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক আইনি বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।

 

আর আন্দোলনকারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তৃতীয় দাবিটি হলো, গোটা রাষ্ট্র ও এই অবক্ষয়গ্রস্ত শাসনব্যবস্থার সর্বোচ্চ পদে আসীন থেকে যিনি সরকার পরিচালনা করছেন, সেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অবশ্যই ভুক্তভোগী কোটি কোটি শিক্ষার্থীর কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।

 

এর আগে গত মঙ্গলবার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে রাজপথে নামা 'ককরোচ জনতা পার্টি' ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পদযাত্রায় যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় পুলিশের বাধার মুখে পড়েছিলেন রাহুল গান্ধী।

 

সেই সময় তাকে পুলিশ জোরপূর্বক আটক করে একটি বাসে সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করে রাখে। সেই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বিরোধীদলীয় এই নেতা এক বিস্ফোরক দাবি তুলে ধরে জানান, আটকের সময় তাকে যখন পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছিল, ঠিক তখনই দায়িত্ব পালনরত এক পুলিশ কর্মকর্তা অত্যন্ত সংগোপনে তার কানে কানে এসে ফিসফিস করে মোদি সরকারের পতন ঘটানোর জন্য আকুল আকুতি জানিয়েছিলেন।

 

একজন সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের কাছ থেকে পাওয়া এই ধরনের মন্তব্য দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরে জমে থাকা গভীর অসন্তোষ ও চরম ক্ষোভেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

সংবাদ সম্মেলনে ভারতের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার চরম ধস ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই বিরোধী নেতা। তিনি অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন যে, গত এক যুগে ভারতে অন্তত ১৫২ বার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।

 

তবে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এই দীর্ঘ বারো বছরে এত বিপুলসংখ্যক গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হওয়া সত্ত্বেও সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আজ পর্যন্ত একজন অপরাধীকেও আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে সক্ষম হয়নি।

 

বারবার প্রশ্নফাঁসের কারণে লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে পতিত হচ্ছে এবং পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি রাষ্ট্রযন্ত্রকে গ্রাস করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

কংগ্রেসের এই শীর্ষ নেতার মতে, বর্তমান সরকার দেশের তরুণ সমাজ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ উদাসীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকা পালন করছে। শিক্ষাব্যবস্থার এই ভয়াবহ ধস কেবল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাই ব্যাহত করছে না, বরং সমগ্র জাতির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

 

সরকারের নীতিহীন আচরণের কারণে দেশের কোটি কোটি পরিবার তাদের কষ্টার্জিত অর্থ হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক দেউলিয়াত্বের মধ্যে দিন পার করতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কেবল মৌখিক আশ্বাস কিংবা এড়িয়ে যাওয়ার নীতি নয়, বরং অনতিবিলম্বে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তি এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে জাতির সামনে স্পষ্ট ক্ষমার ঘোষণাই চলমান সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হতে পারে।

 

দিল্লির রাজপথে শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত এই নির্মম নিগ্রহ ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ঘটনা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে, যা সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যকার দ্বন্দ্বে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

 

- এনডিটিভি