বুধবার, জুলাই ২২, ২০২৬
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নিপীড়নের ভিডিও দেখতে প্রধান বিচারপতির অস্বীকৃতি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৪৮ পিএম

ভারতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নিপীড়নের ভিডিও দেখতে প্রধান বিচারপতির অস্বীকৃতি
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর-মন্তরে চলমান ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি বর্বরোচিত হামলা ও নির্মম নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা এক জরুরি আবেদনের শুনানি অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে নাকচ করে দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।

 

আবেদনকারীর পক্ষের আইনজীবী সর্বোচ্চ আদালতে পুলিশি লাঠিচার্জ ও নিপীড়নের ভিডিও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইলে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।

 

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য এবং ভিডিও প্রমাণ দেখতে অস্বীকৃতি জানানোর বিষয়টি ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো, মানবাধিকার ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ক্ষেত্রে নতুন করে গভীর উদ্বেগ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

বুধবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন একটি বিশেষ বেঞ্চে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হয়। এই বেঞ্চের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনা।

 

আবেদনকারীর আইনজীবী সর্বোচ্চ আদালতকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অবহিত করেন যে, গত সোমবার যন্তর-মন্তরে সম্পূর্ণ অহিংস ও শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানরত নিরীহ ছাত্রদের ওপর পুলিশ বিনা উসকানিতে নৃশংস আচরণ করেছে।

 

এই বর্বরোচিত ঘটনার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে তার কাছে ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে বলেও তিনি আদালতকে জানান। ন্যায়বিচারের স্বার্থে তিনি বৃহস্পতিবারই মামলাটি জরুরি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করার বিনীত অনুরোধ জানান।

 

তবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এই মানবিক আবেদনটি তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, এই ভিডিওর প্রতি আদালতের কোনো আগ্রহ নেই এবং এটি দেখার মতো পর্যাপ্ত সময় তাদের হাতে নেই।

 

সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইনজীবী যখন ন্যায়বিচারের স্বার্থে বারবার ভিডিও প্রমাণের কথা উল্লেখ করে ছাত্রদের ওপর অমানবিক মারধরের অভিযোগটি আদালতের নজরে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করেন, তখন প্রধান বিচারপতি দৃশ্যত ক্ষুব্ধ হয়ে জবাব দেন যে, আইনজীবী যেন আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট না করেন, কারণ তারা কোনোভাবেই এই ভিডিও দেখতে ইচ্ছুক নন।

 

গত সোমবার ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনে অনুষ্ঠিত ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই মূলত পুলিশের এই আগ্রাসী পদক্ষেপ ও আদালত অবমাননাকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।

 

ওই দিন সারা দেশ থেকে আসা হাজারো ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক সরকারি পরীক্ষায় ব্যাপক মাত্রায় প্রশ্নফাঁস ও নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত পদত্যাগের দাবিতে সংসদের দিকে এক বিশাল প্রতিবাদী মিছিল নিয়ে অগ্রসর হন।

 

একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতা পুলিশের তৈরি করা নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুরো পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার অজুহাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ শুরু করে এবং মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।

 

পুলিশের এই অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগের ঘটনায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী এবং পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য গুরুতরভাবে আহত হন। এদিকে, নয়াদিল্লির যন্তর-মন্তরে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও চলমান অবস্থান কর্মসূচি বুধবার সফলভাবে দ্বিতীয় মাসে পদার্পণ করেছে।

 

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, পুলিশি বাধা ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাতভর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও হাজার হাজার সমর্থক সেখানে এসে সমবেত হয়েছেন। ভারী পুলিশি নিরাপত্তা ও চারদিক থেকে অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যেও আন্দোলনস্থলে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে খাদ্য, পানীয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

 

উল্লেখ্য, গত ২০ জুন থেকে শুরু হওয়া এই দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলনে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার, সর্বভারতীয় বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষায় সংঘটিত প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের স্বচ্ছ তদন্ত এবং এসব ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে বর্তমান কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর তাৎক্ষণিক পদত্যাগের দাবি অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করা হচ্ছে।

 

শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক ও ন্যায্য আন্দোলনের প্রতি গভীর সংহতি জানিয়ে আমরণ অনশনরত প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

 

শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি হাসপাতাল থেকেই তার অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অবিচল ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সম্পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অথবা এই চরম সংকটের বিষয়টি সংসদের অধিবেশনে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপনের সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই তিনি তার অনশন ভাঙবেন না। তার এই আত্মত্যাগ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মনোবলকে আরও সুদৃঢ় করেছে।

 

- টাইমস অব ইন্ডিয়া