বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৩, ২০২৬
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
দিল্লিতে প্রতিবাদের নতুন ভাষা

প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে জেন-জিদের প্রধান হাতিয়ার এখন মিম ও ব্যঙ্গচিত্র

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০২৬, ০২:৫২ পিএম

প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে জেন-জিদের প্রধান হাতিয়ার এখন মিম ও ব্যঙ্গচিত্র
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান বিক্ষোভে যুক্ত হয়েছে এক নতুন মাত্রা। চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রবেশিকা পরীক্ষা বা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে দেশের তরুণ সমাজ, বিশেষ করে 'জেন-জি' বা নতুন প্রজন্মের তরুণেরা।

 

চিরাচরিত স্লোগান বা জ্বালাময়ী বক্তৃতার পাশাপাশি তাদের প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে মিম, ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার, ছোট ভিডিও বা রিলস এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতি। প্রতীকী একটি মঞ্চের ব্যানারে সংঘটিত এই আন্দোলনে তরুণরা হাস্যরসকেই রাষ্ট্রযন্ত্রের সমালোচনা এবং নিজেদের দাবি আদায়ের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

 

দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন, বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তরুণদের এই সৃজনশীল প্রতিবাদ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

 

যন্তর মন্তরের চিত্রটি অন্যান্য রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের চেয়ে বেশ আলাদা। এক প্রান্তে যখন দেশাত্মবোধক গান বাজছে এবং স্বেচ্ছাসেবকেরা অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র পরিচালনা করছেন, ঠিক তখনই আরেক প্রান্তে তরুণ আন্দোলনকারীরা ব্যস্ত সাদা কাগজে নিজেদের ক্ষোভকে ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে।

 

 

এমনই একজন সাতাশ বছর বয়সী আন্দোলনকারী পি হোসেন খান, যিনি নিজেকে একজন মিম স্রষ্টা হিসেবে পরিচয় দেন। টানা তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তিনি আন্দোলনস্থলে অবস্থান করছেন এবং প্রতীকী অনশনেও অংশ নিয়েছেন। নিজের একটি পোস্টারে তিনি লিখেছেন যে তার প্রাক্তন প্রেমিকা এবং বর্তমান সরকার-উভয়ই সমানভাবে হৃদয়হীন।

 

তার মতে, যখন অহিংস ও যৌক্তিক দাবিগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না, তখন তীক্ষ্ণ হাস্যরস ও ব্যঙ্গ তাদের দৃষ্টি আকর্ষণে বাধ্য করে। ক্ষমতার দাম্ভিকতার বিরুদ্ধে এই নির্মল হাসি এক ধরনের সূক্ষ্ম অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরোধ বলে তিনি মনে করেন।

 

আন্দোলনস্থলে চোখ বুলালেই এমন অসংখ্য সৃজনশীল এবং তীক্ষ্ণ পোস্টার চোখে পড়ে। আন্দোলনকারীদের অর্থের বিনিময়ে রাস্তায় নামানো হয়েছে বলে যে অভিযোগ প্রায়শই করা হয়, তার জবাবে একটি পোস্টারে লেখা হয়েছে যে তাদের কেউ টাকা দেয় না, তারা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই সরকারের সমালোচনা করেন।

 

আবার আরেকটিতে লেখা হয়েছে, দেশের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে ঘরকুনো বা অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষেরাও বাধ্য হয়ে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে এসেছেন। শুধু তাই নয়, জাতীয় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রশ্নফাঁসের ব্যর্থতাকে চরম কটাক্ষ করে এক নারী শিক্ষার্থী তার প্ল্যাকার্ডে লিখেছেন যে ওই পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ে তার ব্যবহৃত স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রী বা স্যানিটারি প্যাড অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ও সুরক্ষিত।

 

বলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা থেকে শুরু করে পৌরাণিক মহাকাব্য-সবকিছুকেই এই তরুণরা তাদের প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত করেছেন। একটি পোস্টারে জনপ্রিয় একটি সিনেমার ব্যঙ্গাত্মক অনুকরণ করে সেখানে প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর ছবি বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

 

এমনকি মহাভারতের বিখ্যাত চরিত্র কৃষ্ণ ও অর্জুনের কাল্পনিক কথোপকথন ব্যবহার করেও শিক্ষামন্ত্রীকে অবিলম্বে পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কের বিষয়টিকে কটাক্ষ করে শিক্ষার্থীরা স্লোগান তুলেছেন, সরকার যেন অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত না থেকে দেশের ভবিষ্যতের দিকে নজর দেয়।

 

ডিজিটাল মাধ্যমেও এই প্রতিবাদের ঢেউ সমানভাবে আছড়ে পড়েছে। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালানোর ভিডিওগুলোকে জনপ্রিয় ভিডিও গেম 'সাবওয়ে সারফার্স'-এর আদলে সম্পাদনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

 

টিয়ারগ্যাসের ঝাঁজালো ধোঁয়াকেও দিল্লির দূষিত এলাকার ড্রেনের দুর্গন্ধের সঙ্গে তুলনা করে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। উনিশ বছর বয়সী শিল্পকলার শিক্ষার্থী সানা জানান, সামনে পরীক্ষা থাকা সত্ত্বেও তিনি আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন কারণ আজ নিট পরীক্ষার্থীরা যে অবিচারের শিকার হচ্ছেন, আগামীকাল যে অন্য কোনো শিক্ষার্থী একই সমস্যার মুখোমুখি হবেন না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যন্তর মন্তরের এই আন্দোলন কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং ডিজিটাল মাধ্যমেও সমানভাবে বিস্তৃত।

 

নতুন প্রজন্মের এই সৃজনশীলতা প্রমাণ করেছে যে আধুনিক ডিজিটাল যুগে প্রতিবাদের ভাষা ও ধরন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে, যেখানে প্রথাগত স্লোগানের চেয়ে একটি অর্থবহ ব্যঙ্গচিত্র অনেক বেশি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দিতে সক্ষম।