এই চলমান বিক্ষোভের মাঝেই গত বুধবার এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হলো গোটা ভারত। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একদল সাধারণ শিক্ষার্থীকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় সম্পূর্ণ একাকী একটি চলন্ত পুলিশ ভ্যানের পথ আটকে দাঁড়ান ওই তরুণী, যা মুহূর্তে গোটা দেশের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এই সাহসী তরুণীর নাম রিয়া অহির। ভিডিও ফুটেজে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা যায়, মুম্বাইয়ের দাদারে অবস্থিত বিখ্যাত শিবাজী পার্কের কাছে একটি চলন্ত পুলিশ ভ্যানের ঠিক সামনে গিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন তিনি।
এ সময় ভেতরে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাকে বারবার সরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও তিনি তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামছিল, আর সেই তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই মাথায় ক্যাপ ও গায়ে হুডি পরিহিত অবস্থায় রিয়া ভ্যানটির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দুই হাত দিয়ে সেটির গতিপথ আটকে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান।
রাষ্ট্রযন্ত্রের এমন বিশাল শক্তির সামনে একা এক তরুণীর এমন অসীম সাহসিকতা দেখে সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষ রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে যান। চারপাশ থেকে জনতা তাকে বিপুল করতালি দিয়ে উৎসাহ জোগাতে থাকে এবং তার সমর্থনে বিভিন্ন স্লোগান দিতে শুরু করে।
পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, রিয়ার এই দৃঢ় এবং আপসহীন বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত আটক করা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় মুম্বাই পুলিশ। এই ঘটনাটি শুধু আন্দোলনকারীদেরই নয়, বরং অধিকার আদায়ে সোচ্চার সাধারণ নাগরিকদেরও দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে রিয়া অহির তার এই পদক্ষেপের পেছনের কারণ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বশীল আচরণ করছে না।
তার মতে, পুলিশ যদি সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়, তবে বাধ্য হয়ে নাগরিকদেরই সেই দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে হবে। রিয়া আরও জানান যে, তিনি নিজে বর্তমানে কোনো শিক্ষার্থী না হলেও, আন্দোলনরত এই তরুণদের যে ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি রয়েছে, তার প্রতি তার পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন রয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি সম্প্রতি দিল্লিতে ঘটে যাওয়া পুলিশি নিপীড়নের তীব্র নিন্দা জানান। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতির মতো জঘন্য অপরাধের প্রতিবাদে দিল্লিতে সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রার সময় ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকদের ওপর পুলিশের ছোড়া টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর এ ধরনের রাষ্ট্রীয় নির্যাতন কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে মেনে নেওয়া যায় না।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিয়ার এই অসামান্য প্রতিবাদের ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তিনি প্রশংসায় ভাসছেন। নেটিজেনদের অনেকেই তাকে ‘বাস্তবের নায়ক’ বা রিয়েল লাইফ হিরো হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মুম্বাইয়ের জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা রোহান জোশী ইনস্টাগ্রামে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা শেয়ার করেছেন।
তিনি লিখেছেন, মুম্বাইয়ের তরুণ সমাজ আজ বুকে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে রাজপথে নেমেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের আচরণে এক অভাবনীয় ও প্রশংসনীয় সংযম রয়েছে। পুলিশ তাদের সঙ্গে টানা-হেঁচড়া করে আটক করার চেষ্টা করলেও তারা নিজেদের অধিকার আদায়ে অত্যন্ত মার্জিত, সুশৃঙ্খল অথচ দৃঢ়ভাবে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে।
দেশজুড়ে আলোচিত এই তরুণী রিয়া অহির মূলত একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, তিনি একাধারে একজন উঠতি অভিনেত্রী, মডেল এবং সফল নারী উদ্যোক্তা। সামাজিক এই মাধ্যমটিতে তার প্রায় এক লাখের কাছাকাছি অনুসারী রয়েছে।
ইতোমধ্যেই বেশ কিছু জনপ্রিয় মিউজিক ভিডিওতে তার উপস্থিতি দর্শকদের নজর কেড়েছে, যার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত 'দিলবারা' নামের মিউজিক ভিডিওটি অন্যতম। বিনোদন জগতের পাশাপাশি একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবেও তিনি কাজ করছেন।
মূলত হস্তশিল্প ও নিজস্ব ডিজাইনের পোশাক নিয়ে কাজ করা রিয়ার 'রিয়াসত' নামে একটি ব্যক্তিগত ফ্যাশন ব্র্যান্ডও রয়েছে। দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির ব্যানারে শুরু হওয়া এই ছাত্র আন্দোলনের রেশ এখন ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়েও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
পরীক্ষায় নজিরবিহীন অনিয়ম এবং দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি দমনপীড়নের প্রতিবাদে বুধবার টানা তৃতীয় দিনের মতো মুম্বাইয়ের রাজপথ ছিল আন্দোলনকারীদের স্লোগানে মুখর। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী এবং দলমত নির্বিশেষে সাধারণ শিক্ষার্থীরা শিবাজী পার্ক, চৈত্যভূমি, চেম্বুর ও শিবসেনা ভবনের সামনে একযোগে বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
তবে আন্দোলন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বেশ কড়াকড়ি আরোপ করেছে। পুলিশের আনুষ্ঠানিক ভাষ্যমতে, ১৮ থেকে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বেআইনি সমাবেশের অভিযোগে মুম্বাইয়ে অন্তত ১৩টি মামলা বা এফআইআর দায়ের করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৪০০ জন আন্দোলনকারীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।