টানা কয়েকদিন ধরে চলা অধিকার আদায়ের এই আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা এই তরুণ নেতা শারীরিক অসুস্থতার কারণে সাময়িকভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে বিরতি নিতে বাধ্য হয়েছেন।
তবে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তার এই বিরতি কেবলই সাময়িক বিশ্রাম মাত্র এবং কিছুটা সুস্থতা বোধ করলেই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যেই তিনি পুনরায় যন্তর মন্তরের প্রতিবাদ মঞ্চে ফিরে আসবেন।
অন্যদিকে, এই আন্দোলনের মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত দেশজুড়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে শাস্তির আওতায় আনতে বিশেষ দ্রুত বিচার আদালত গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন, যা চলমান সংকট নিরসনে সরকারের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের এই দীর্ঘ সংগ্রামে প্রথম সারিতে থাকা অভিজিৎ দীপকে বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থার কথা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।
তিনি তার ওই বার্তায় উল্লেখ করেন যে, গত কয়েকদিন ধরে টানা কর্মসূচির কারণে তিনি প্রচণ্ড জ্বর এবং তীব্র শরীর ব্যথায় ভুগছেন। শারীরিক এই চরম প্রতিকূল অবস্থা সামাল দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি বাধ্য হয়ে নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ করছেন।
নিজের অনুসারী, সাধারণ শিক্ষার্থী ও সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় লেখেন যে, বৃহস্পতিবার সকালে যন্তর মন্তরে উপস্থিত থাকতে না পারার জন্য তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
তবে তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে শারীরিক শক্তি পুনরুদ্ধার করার একান্ত প্রয়োজন রয়েছে এবং সবকিছু ঠিক থাকলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যেই তিনি আবারও প্রতিবাদস্থলে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনের সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব প্রদান করবেন।
নয়াদিল্লির এই ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন মূলত ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগের একদফা দাবিতে পরিচালিত হচ্ছে। অভিজিৎ দীপকেসহ হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিক তাদের এই দাবিতে এখনো পর্যন্ত সম্পূর্ণ অনড় রয়েছেন।
শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। তবে গত কয়েকদিন ধরে চলা এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বুধবার রাতে হঠাৎ করেই চরম আকার ধারণ করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক ও ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ করে এবং ছত্রভঙ্গ করতে একাধিক কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে যে, বিক্ষোভকারীদের একটি বিশাল অংশ যখন ব্যারিকেড ভেঙে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে জোরপূর্বক অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন তাদের আইনানুগভাবে বাধা দিতে গেলে আন্দোলনকারীরা পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ইট, পাথর ও পানির বোতল নিক্ষেপ করতে শুরু করে।
পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই পুলিশ শক্তি প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়। তবে এই পুলিশি হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন অভিজিৎ দীপকে। বৃহস্পতিবার সকালে তিনি এক সংবাদ বিবৃতিতে নিরীহ ও নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের এই বর্বরোচিত ও নৃশংস আচরণের বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে এটিকে গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ বলে আখ্যায়িত করেন।
এদিকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই তীব্র সামাজিক অসন্তোষ এবং ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং সরকারের কঠোর অবস্থান দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার করতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন।
তিনি প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য ও জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংসকারী অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুততম সাজা নিশ্চিত করতে দেশে দ্রুত বিচার আদালত গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা এবং ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী ও কঠোর সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।
সম্প্রতি পার্লামেন্ট ভবনে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের সংসদীয় দলের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয় এবং সর্বসম্মতিক্রমে অপরাধীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ ও বিস্তারিত বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশের আপামর জনসাধারণ ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, তরুণ প্রজন্মের সার্বিক কল্যাণ সাধন এবং তাদের একটি নিরাপদ ও বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, দেশের তরুণদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো কিছুই একটি রাষ্ট্রের কাছে হতে পারে না। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার মাধ্যমে যারা শিক্ষার্থীদের মেধা, স্বপ্ন ও নিরলস পরিশ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, তাদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতেই সরকার দ্রুত বিচার আদালত গঠনের এই ঐতিহাসিক আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান যে, এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি, কাঠামোগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ইতোমধ্যে সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
এটি মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থ সুরক্ষায় সরকারের নেওয়া ধারাবাহিক পদক্ষেপেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সবশেষে তিনি চরম কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যারা নিজেদের হীন স্বার্থে দেশের ভবিষ্যৎ রূপকার তরুণদের জীবন ধ্বংস করার সামান্যতম অপচেষ্টা করবে, রাষ্ট্রীয় আইনে তাদের কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।