সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আসামে এলে ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হবে, রাহুলকে হিমন্তের কড়া হুঁশিয়ারি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম

আসামে এলে ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হবে, রাহুলকে হিমন্তের কড়া হুঁশিয়ারি
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনে অনুপ্রবেশ ইস্যুকে কেন্দ্র করে শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের মধ্যে উত্তেজনা আবারও নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ এবং আক্রমণাত্মক বাক্যবিনিময়ের এই পর্যায়ে আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজেপির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা ভারতের লোকসভার প্রধান বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কঠোর ও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন।

 

রবিবার, ১ নভেম্বর হিমাচল প্রদেশের রাজধানী শিমলায় আয়োজিত বিজেপির এক দলীয় কর্মসূচিতে বক্তব্য প্রদানকালে হিমন্ত বিশ্বশর্মা অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি কংগ্রেসের কথিত সহানুভূতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি সরাসরি রাহুল গান্ধীকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, আসামে এলে তাকে ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ভারতের এই রাজনৈতিক উত্তাপকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যা ও অনুপ্রবেশ নীতি দেশটির জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান একটি কৌশলগত ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

 

হিমাচল প্রদেশের ওই রাজনৈতিক জনসভায় উপস্থিত বিপুল সংখ্যক দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের সামনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এবং দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। তার বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশ থেকে ভারতে কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং এই অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি কংগ্রেস দল ও রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক অবস্থান।

 

হিমন্ত বিশ্বশর্মা অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেন যে, ভারতের মাটিতে, বিশেষ করে আসামে, কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর স্থান নেই। তিনি রাহুল গান্ধীকে তীব্র কটাক্ষ করে বলেন যে, অবৈধ বাংলাদেশিদের প্রতি কংগ্রেস নেতার যদি সত্যিই এত গভীর দরদ ও সহানুভূতি থাকে, তবে তার উচিত অবিলম্বে বাংলাদেশে চলে যাওয়া।

 

শুধু তাই নয়, তিনি রাহুল গান্ধীকে ভারতের রাজনীতি ছেড়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার এবং সেখানে গিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার এক অভিনব ও বিদ্রূপাত্মক পরামর্শও প্রদান করেন। তার এই বক্তব্য সভাস্থলে উপস্থিত দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করে।

 

রাহুল গান্ধীর প্রতি রাজনৈতিক আক্রমণ শানাতে গিয়ে হিমন্ত বিশ্বশর্মা তার স্বভাবসুলভ কড়া ভাষার পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যঙ্গের আশ্রয়ও গ্রহণ করেন। তিনি প্রধান বিরোধী দলনেতাকে একপ্রকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে আসাম সফরের আমন্ত্রণ জানান।

 

তিনি অত্যন্ত বিদ্রূপের সুরে বলেন যে, রাহুল গান্ধী যদি আসামে আসেন, তবে তাকে উপযুক্ত ‘ব্যবস্থা’ গ্রহণের মাধ্যমে সোজা বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় তিনি প্রতিবেশী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম শীর্ষ বিজেপি নেতা এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নামও যুক্ত করেন।

 

হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন যে, তিনি নিজে এবং শুভেন্দু অধিকারী মিলে রাহুল গান্ধীর জন্য প্যারাসুটের মাধ্যমে অবতরণের বিশেষ ব্যবস্থা করবেন, যাতে তাকে নির্বিঘ্নে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া যায়।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই ধরনের বক্তব্য কেবল রাহুল গান্ধীর প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণই নয়, বরং এটি ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিজেপির অনুপ্রবেশবিরোধী রাজনৈতিক এজেন্ডাকে আরও সুদৃঢ় করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।

 

এই রাজনৈতিক সমাবেশের মঞ্চ থেকে আসামের মুখ্যমন্ত্রী কেবল অনুপ্রবেশ ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি কংগ্রেস দলের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়েও অত্যন্ত নেতিবাচক ও কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

 

হিমন্ত বিশ্বশর্মা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, ভারতের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে কংগ্রেস দলের সময় শেষ হয়ে এসেছে এবং তারা আর কখনোই দেশের ক্ষমতায় ফিরে আসতে সক্ষম হবে না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের মতো একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে সরকার পরিবর্তন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সাধারণ জনগণের ভোটের ওপর।

 

ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে তাদের রায় প্রদান করেন। কংগ্রেস দল প্রায়শই নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য ইভিএম কারচুপির অভিযোগ তুলে থাকে, সেই প্রসঙ্গের অবতারণা করে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, কংগ্রেস এখন এমন একটি রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে তারা কেবল আধুনিক ইভিএমেই নয়, বরং সনাতন পদ্ধতির ব্যালট পেপারের ভোটেও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হচ্ছে।

 

তার মতে, কংগ্রেস জনগণের আস্থা সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলেছে। হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই তীব্র আক্রমণাত্মক বক্তব্যের একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। মূলত রবিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক জোটের এক বিশাল মহাসমাবেশে রাহুল গান্ধীর দেওয়া একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও কড়া বক্তব্যের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই বিজেপির এই পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়েছে।

 

ওই মহাসমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাহুল গান্ধী ভারতের বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। তিনি সরাসরি ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে তাকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়েছিলেন।

 

শুধু পদত্যাগের দাবিই নয়, রাহুল গান্ধী হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, সুযোগ পেলে ওই নির্বাচন কমিশনারকে জেলে পাঠানো হবে। ভারতের একটি সাংবিধানিক পদের অধিকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিরোধী দলনেতার এমন অভূতপূর্ব ও কড়া আক্রমণের পর স্বাভাবিকভাবেই শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়, যারই একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হলো শিমলায় হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই আক্রমণাত্মক ও বিদ্রূপাত্মক বক্তব্য। এই পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক আক্রমণের ফলে ভারতের জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ আরও বেশি সংঘাতময় হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।