বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬
২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউটিউব দেখে জাল নোটের বিশাল কারখানা, গ্রেফতার চার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

ইউটিউব দেখে জাল নোটের বিশাল কারখানা, গ্রেফতার চার
ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির এই অভাবনীয় উৎকর্ষের যুগে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের দৈনন্দিন জ্ঞান অর্জন, যোগাযোগ ও বিনোদনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

 

কিন্তু প্রযুক্তির এই অবাধ তথ্যপ্রবাহ এবং উন্মুক্ত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসাধু মানুষ ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র নিত্যনতুন উপায়ে সমাজে অপরাধের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন শিক্ষামূলক কনটেন্টের আড়ালে এমন অনেক ভিডিও বা তথ্য রয়েছে, যা অপরাধীদের নতুন অপরাধের কৌশল শিখতে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে।

 

ঠিক এমনই এক অভিনব, চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী হলো প্রতিবেশী দেশ ভারত। জনপ্রিয় ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখে রীতিমতো প্রশিক্ষণ নিয়ে জাল নোট তৈরির নিখুঁত কৌশল রপ্ত করেছিলেন এক ব্যক্তি।

 

শুধু কৌশল শেখাই নয়, নিজের সেই ইন্টারনেটলব্ধ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে একটি সাধারণ ভাড়া বাড়িতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন জাল নোট ছাপানোর এক বিশাল ও অত্যাধুনিক কারখানা। ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী হায়দরাবাদের উপকণ্ঠে এমনই একটি ভয়ংকর ও সুসংগঠিত জাল নোট তৈরির চক্রের সন্ধান পেয়েছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

এই অপরাধী চক্রের বিশাল নেটওয়ার্ক, তাদের অপরাধের ধরন এবং বিপুল পরিমাণ জাল মুদ্রার মজুত দেখে রীতিমতো হতবাক হয়েছেন দুঁদে পুলিশ কর্মকর্তারা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবং পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য সূত্রে জানা গেছে, এই বিপুল পরিমাণ জাল নোট তৈরির সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে পুলিশ চারজন মূল হোতাকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।

 

গ্রেফতারকৃত এই চার ব্যক্তির নাম হলো-মাদুপোজু কর্ণাকার, চিন্নোল্লা মানিক্য রেড্ডি, চেরুকুপেল্লি রত্নাকর রেড্ডি এবং করণম অজয় কুমার। তবে পুলিশের এই ঝটিকা অভিযানের বিষয়টি আগে থেকেই টের পেয়ে চক্রটির সঙ্গে যুক্ত আরও তিনজন সদস্য সুকৌশলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

 

পলাতক এই তিন অপরাধীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের একাধিক বিশেষ দল বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে। অত্যন্ত গোপন ও নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সংবাদের ভিত্তিতে গত ১ নভেম্বর এই চাঞ্চল্যকর অপরাধী চক্রটির প্রথম সন্ধান পায় পুলিশ।

 

ওই দিন রামোজি ফিল্ম সিটির কাছাকাছি অবস্থিত ৬৫ নম্বর জাতীয় সড়কের ওপর একটি সন্দেহভাজন গাড়িকে থামার সংকেত দেয় আবদুল্লাপুরমেট থানা পুলিশ ও শাদনগর বিশেষ অভিযান দলের চৌকস সদস্যরা।

 

গাড়িটিতে তল্লাশি চালিয়ে প্রথম দফায় ৫০০ টাকার জাল নোটের এক বিশাল স্তূপ উদ্ধার করা হয়, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় আট লাখ টাকা। হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়ার পরপরই গাড়িতে অবস্থানরত ওই চারজনকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।

 

গ্রেফতারের পর অপরাধীদের থানায় নিয়ে গিয়ে শুরু হয় নিবিড় ও কৌশলগত জিজ্ঞাসাবাদ। তাদের দেওয়া তথ্য এবং পুলিশের নিজস্ব তদন্তের সূত্র ধরে হায়দরাবাদের উপকণ্ঠে অবস্থিত কুন্টলুর এলাকার একটি নির্জন ভাড়া বাড়ির সন্ধান পান তদন্তকারী কর্মকর্তারা।

 

ওই নির্দিষ্ট বাড়িটিতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ যা দেখতে পায়, তা আক্ষরিক অর্থেই ছিল অবিশ্বাস্য। বাইরে থেকে দেখতে অত্যন্ত সাধারণ একটি বসতবাড়ি মনে হলেও, এর ভেতরে অত্যন্ত গোপনে চলছিল জাল মুদ্রা তৈরির এক বিশাল মহাযজ্ঞ।

 

মূলত ওই ভাড়া বাড়িটিকেই অপরাধীরা জাল নোট ছাপানোর একটি অত্যাধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কারখানায় রূপান্তরিত করেছিল। পুলিশের চৌকস দল ওই গোপন কারখানা থেকে তল্লাশি চালিয়ে আরও ১৩৪টি বান্ডিল উদ্ধার করে, যার প্রতিটিই ছিল ৫০০ টাকার চকচকে জাল নোটে ভর্তি।

 

উদ্ধারকৃত এই নতুন নোটগুলোর আনুমানিক মূল্য ছয় কোটি সত্তর লাখ টাকা। অর্থাৎ, প্রথম দফায় গাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া আট লাখ টাকাসহ সব মিলিয়ে এই সংঘবদ্ধ চক্রের কাছ থেকে মোট ছয় কোটি আটাত্তর লাখ টাকা মূল্যের নিখুঁত জাল নোট উদ্ধার করা হয়েছে।

 

শুধু বিপুল অঙ্কের এই জাল নোটই নয়, এই মুদ্রা ছাপানোর কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন অত্যাধুনিক সরঞ্জামও পুলিশ ওই কারখানা থেকে বাজেয়াপ্ত করেছে। জব্দ করা এসব সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রঙিন মুদ্রণযন্ত্র বা প্রিন্টার, নিখুঁত ছবি ধারণের জন্য স্ক্যানার, বহনযোগ্য কম্পিউটার বা ল্যাপটপ, লেমিনেশন মেশিন এবং নোটগুলোকে সঠিক মাপে কাটার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন সূক্ষ্ম কাটিং সরঞ্জাম।

 

এই পুরো চক্রটির মূল হোতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মাদুপোজু কর্ণাকার নামের এক ব্যক্তিকে। ফিউচার সিটি পুলিশের কমিশনার তরুণ যোশী সাংবাদিকদের সামনে এক আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে এই চাঞ্চল্যকর অপরাধের পেছনের চমকপ্রদ গল্প তুলে ধরেন।

 

তিনি বিস্তারিতভাবে জানান যে, মাদুপোজু কর্ণাকার আগে থেকে কোনো পেশাদার বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অপরাধী ছিলেন না। তিনি মূলত ইউটিউব এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ভিডিও অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে জাল নোট তৈরির নিখুঁত কৌশলগুলো শিখেছিলেন।

 

কোন ধরনের বিশেষ কাগজ ব্যবহার করলে নোটটি ছুঁলে আসল মনে হবে, জলছাপ কীভাবে নিখুঁতভাবে দিতে হয়, সুরক্ষা সুতা কীভাবে বসাতে হয় এবং রঙিন প্রিন্টারের কালির সঠিক মিশ্রণ কীভাবে তৈরি করতে হয়-এসব অতি সূক্ষ্ম ও কারিগরি বিষয়গুলো তিনি ইন্টারনেটের মাধ্যমেই দিনের পর দিন গবেষণা করে রপ্ত করেছিলেন।

 

পরবর্তীতে নিজের এই ইন্টারনেটলব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তিনি অন্যান্য সহযোগীদের নিয়ে জাল নোট তৈরির এই বিশাল ও অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। উন্মুক্ত প্রযুক্তির এই ধরনের মারাত্মক নেতিবাচক ব্যবহার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

তদন্তকারী কর্মকর্তারা তদন্তের স্বার্থে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন, যা এই চক্রের প্রতারণার ও ধূর্ততার মাত্রাকে আরও এক ধাপ ওপরে নিয়ে গেছে। চক্রটির প্রাথমিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ছিল, তারা সাধারণ মানুষের কাছে এক লাখ টাকা আসল নগদ অর্থের বিনিময়ে তিন থেকে চার লাখ টাকার জাল নোট সরবরাহ করবে।

 

লোভনীয় এই প্রস্তাব দিয়ে তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অবৈধ টাকার পাহাড় গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু তাদের এই অবৈধ লেনদেনের প্রস্তাবনায় সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে তারা আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছিল না। মানুষজন জাল নোট কিনতে ততটা আগ্রহ দেখাচ্ছিল না।

 

কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ক্রেতা না পেয়ে তারা তাদের প্রতারণার ধরনে পরিবর্তন আনে এবং এক নতুন ও ভয়ংকর কৌশল অবলম্বন করে। পুলিশের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জন করার জন্য চক্রের সদস্যরা প্রথমে তাদের হাতে কিছু আসল টাকার নোট তুলে দিত।

 

যখন ক্রেতারা বুঝতে পারত যে নোটগুলো আসল এবং তারা বড় অঙ্কের লেনদেনে রাজি হয়ে নগদ অর্থ নিয়ে আসত, ঠিক তখনই শুরু হতো তাদের আসল নাটক। অবৈধ লেনদেনের সময় চক্রের অন্য সদস্যরা হঠাৎ করেই ভুয়া পরিচয়পত্র নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হতো।

 

তারা নিজেদের পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের ব্যাপক ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করত। জাল নোটের অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার দায়ে তাদের তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার করা হবে—এমন ভয় দেখিয়ে ক্রেতাদের কাছে থাকা আসল নগদ অর্থ পুরোটাই তারা জোরপূর্বক হাতিয়ে নিত।

 

সাধারণ মানুষকে বোকা বানানোর জন্য তারা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ভুয়া পরিচয়পত্র, ওয়াকিটকি, নকল আগ্নেয়াস্ত্র এবং জাল নম্বর প্লেটযুক্ত গাড়ি ব্যবহার করত, যাতে সবাই তাদের সত্যিই পুলিশের বিশেষ অভিযানকারী দল বলে মনে করে।

 

ভয়ে ও আতঙ্কে ক্রেতারা আইনি ঝামেলার হাত থেকে বাঁচতে নিজেদের কষ্টার্জিত আসল টাকা তাদের হাতে তুলে দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করত। এভাবেই তারা একটি নয়, বরং জোড়া প্রতারণার ফাঁদ পেতে সাধারণ মানুষের অর্থ লুট করছিল।

 

পুলিশের নিবিড় তদন্তে ইতিমধ্যে এমন দুটি পৃথক ঘটনার সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। এই অভিনব কায়দায় তারা সম্প্রতি দুই সম্ভাব্য ক্রেতার কাছ থেকে যথাক্রমে দুই লাখ ও তিন লাখ টাকা, অর্থাৎ সর্বমোট পাঁচ লাখ আসল টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

 

একটি দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য এই ধরনের জাল মুদ্রার কারবার কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা অর্থনীতিবিদদের অজানা নয়। এই বিপুল পরিমাণ জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে পড়লে তা নিঃসন্দেহে স্থানীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলত।