সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর বিতর্কিত পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও তীক্ষ্ণ ভাষায় সমালোচনা করেছেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম) দলের প্রধান এবং হায়দরাবাদের বর্ষীয়ান সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি।
তাঁর অভিযোগ, দেশজুড়ে অনুপ্রবেশকারীর একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও সাজানো গল্প প্রচার করে সুপরিকল্পিতভাবে মুসলিম সম্প্রদায়কে নিশানা করা হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার ধোয়া তুলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষকে নাগরিকত্বের নামে হয়রানি করা হচ্ছে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে দেশের প্রাচীন ও সংখ্যালঘু সংস্কৃতির ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর ওপর চরম আঘাত হানা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই ঘটনাপ্রবাহ ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিকে নতুন করে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। ভারতে ভোটার তালিকায় অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার যে অভিযোগ দীর্ঘকাল ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মহল থেকে করা হচ্ছিল, তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সম্প্রতি দেশটিতে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল ভোটার তালিকা থেকে বিদেশি নাগরিক বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নাম শনাক্ত করে তা বাতিল করা। কিন্তু সরকারি পর্যায়ের এই নিবিড় তদন্ত শেষে যে ফলাফল উঠে এসেছে, তা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের প্রচারণাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রমাণ করেছে।
হায়দরাবাদের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আর ভি কারনান আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তাদের পরিচালিত এই ব্যাপক যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় কোনো বিদেশি নাগরিক বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সরকারি কর্মকর্তার এই দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) সহ উগ্র ডানপন্থী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দাবিকে বিরাট এক প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
এই প্রসঙ্গে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর নাম খোঁজার এই সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন সমাজের প্রান্তিক, দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ।
নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষদের অবর্ণনীয় দুর্দশার সম্মুখীন হতে হয়েছে। নিজের দেশের নাগরিকত্ব প্রমাণের তাগিদে সরকারি দপ্তরগুলোতে দিনের পর দিন ধরনা দিতে গিয়ে একজন সাধারণ দিনমজুরকে অন্তত দুই থেকে তিন দিনের মূল্যবান কর্মসংস্থান ও মজুরি হারাতে হয়েছে।
প্রয়োজনীয় আইনি নথি সংগ্রহ করা, নথির ত্রুটি সংশোধন করা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে গিয়ে হাজার হাজার খেটে খাওয়া মানুষকে যে সীমাহীন অর্থনৈতিক ও মানসিক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, তার কোনো ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্র দেয়নি।
ওয়াইসির মতে, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছিল না, বরং এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে আতঙ্কিত করার এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার একটি সুকৌশলী রাজনৈতিক হাতিয়ার।
নাগরিকত্ব প্রমাণের এই হয়রানির পাশাপাশি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর অস্তিত্বও এখন চরম হুমকির মুখে। ওয়াইসি তাঁর বক্তব্যে নয়াদিল্লির কৃষি ভবন এলাকায় অবস্থিত শতাব্দীপ্রাচীন কাদেমি মসজিদ ভেঙে ফেলার সরকারি উদ্যোগের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন। ভারত সরকারের বহুল আলোচিত সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের আওতায় একটি কমন সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট বা কেন্দ্রীয় সচিবালয় নির্মাণের অংশ হিসেবে এই ঐতিহাসিক মসজিদটি তার আদি স্থান থেকে সরিয়ে ফেলার বা ভেঙে ফেলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এই পদক্ষেপের বৈধতা প্রমাণ করতে গিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লি হাইকোর্টে যে যুক্তি উপস্থাপন করেছে, তা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে দাবি করা হয়েছে যে, সরকারি সম্পত্তির একটি নিজস্ব ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রয়েছে এবং সেই সম্পত্তির ওপর একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় উপাসনালয় বা মসজিদের অবস্থান সেই ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কেন্দ্রীয় সরকারের এমন পরস্পরবিরোধী যুক্তির অত্যন্ত কড়া ও যৌক্তিক জবাব দিয়েছেন আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। তিনি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রকৃত চর্চা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে বলেন, যদি সরকারের মেগা প্রজেক্ট সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে পূর্ণাঙ্গ 'ভূমিপূজা' অনুষ্ঠিত হতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সেটি উদযাপিত হতে পারে, তাহলে সেই একই সরকারি জমিতে একটি ঐতিহাসিক মসজিদের অবস্থান কেন ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী বলে গণ্য হবে?
রাষ্ট্রের চোখে যদি সব ধর্ম সমান হয়, তবে এক ধর্মের আচার রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হওয়ার সময় ধর্মনিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন না হলে, অন্য ধর্মের একটি প্রাচীন উপাসনালয় কেন সরকারের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে? ওয়াইসির এই তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোতে ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞাকেই এক বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
কাদেমি মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে ওয়াইসি স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই স্থাপনাটি কোনো সাম্প্রতিক কালের নির্মাণ নয়। ১৯১২ সালের অনেক আগেই এই কাদেমি মসজিদটি বর্তমান স্থানে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত ছিল।
ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ বলছে, ব্রিটিশ শাসনামলে যখন এডউইন লুটিয়েনসের নকশায় আধুনিক নয়াদিল্লি বা লুটিয়েনস দিল্লি নির্মাণের জন্য বিশাল পরিসরে জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছিল, তখন খোদ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারও এই মসজিদটির ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিল।
সেই কারণে ব্রিটিশরাও মসজিদটি অধিগ্রহণের বাইরে রেখেছিল এবং এর কোনো ক্ষতি করেনি। ওয়াইসি জোরালোভাবে দাবি করেন যে, কাদেমি মসজিদ কেবল মুসলিমদের একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি ভারতের শত শত বছরের মিশ্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও স্থাপত্যকলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এমন একটি ঐতিহাসিক নিদর্শনকে উন্নয়নের অজুহাতে মুছে ফেলার চেষ্টা মূলত ভারতের ইতিহাস থেকেই একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের অবদানকে মুছে ফেলার বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ। এই উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানে অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম) প্রধান সরাসরি ভারতের কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেণ রিজিজুর জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
ওয়াইসির মতে, সরকারের উচিত অবিলম্বে মসজিদটির ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও আইনি মর্যাদা স্বীকার করে নেওয়া এবং এটি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যদি এই ঐতিহাসিক সম্পত্তির মালিকানা বা জমি সংক্রান্ত কোনো আইনি বিরোধ সত্যিই থেকে থাকে, তবে সেটি গায়ের জোরে বা বুলডোজার দিয়ে সমাধান না করে আইনি প্রক্রিয়ায় ওয়াক্ফ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তি করা যেতে পারে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো আইনি জটিলতা নিরসনের জন্য সুনির্দিষ্ট বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে, যা এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসের উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
পরিশেষে, ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে মুসলিম সম্প্রদায়কে নিয়ে চরম ডানপন্থী নেতাদের ধারাবাহিক অবমাননাকর ও অপমানজনক মন্তব্যেরও কঠোর সমালোচনা করেন আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপি ও সমমনা দলের অনেক নেতা প্রকাশ্য জনসভায় ও গণমাধ্যমে মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানকে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন।
বিশেষ করে, ভারতীয় মুসলমানদের ব্যঙ্গ করে 'আব্দুল' নামে সম্বোধন করা এবং তাদের জীবনযাত্রাকে কেবল রাস্তার পাশে বসে সাইকেলের টায়ার বা পাংচার সারানোর মতো কায়িক শ্রমের কাজে সীমাবদ্ধ বলে কটাক্ষ করার মতো বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান তিনি।
ওয়াইসি স্পষ্ট করে দেন যে, ভারতীয় মুসলিমরা এই দেশের সমান অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক এবং দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে তাদের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই।
এ ধরনের বর্ণবাদী ও অপমানজনক রাজনৈতিক বয়ান কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সম্মানই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং এটি ভারতের মতো একটি বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল চেতনাকেই ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অনুপ্রবেশকারীর মিথ্যা তকমা থেকে শুরু করে ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদ এবং সর্বশেষে জাতিগত কটূক্তি-এই সবকিছুই একটি বৃহত্তর বৈষম্যমূলক নীতির অংশ বলে তিনি তাঁর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।