রবিবার, ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
২২ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পুণ্যার্থীদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে রাহুল গান্ধীর গভীর শোক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৫, ১২:২৪ পিএম

পুণ্যার্থীদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে রাহুল গান্ধীর গভীর শোক
ছবি: ANI

অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলাম জেলায় একটি মন্দিরে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত নয়জন পুণ্যার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। শনিবারের এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি তিনি আন্তরিক সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি, রাজ্য সরকারকে দ্রুত ও সহানুভূতিশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এই বিপর্যয়টি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে জনসমাগম ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভয়াবহ গাফিলতি এবং কাঠামোগত ত্রুটির বিষয়টিকে আবারও জাতীয় পরিসরে সামনে নিয়ে এসেছে।

 

শনিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৫, অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলাম জেলার পালসা মণ্ডলের কাসিবুগ্গা শহরে অবস্থিত শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী মন্দিরে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। পবিত্র 'কার্তিক মাস' এবং 'একাদশী' তিথি একই দিনে পড়ায়, এবং দিনটি শনিবার হওয়ায়, মন্দিরে পুণ্যার্থীদের অভূতপূর্ব ভিড় জমে। যেখানে মন্দিরটির স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা মাত্র দুই থেকে তিন হাজার, সেখানে সকাল থেকেই প্রায় ২৫,০০০ ভক্তের সমাগম ঘটে, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দেয়।

 

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং পুলিশি সূত্রানুযায়ী, দুর্ঘটনাটি ঘটে সকাল আনুমানিক সাড়ে এগারোটা নাগাদ। মন্দিরটি একটি ভবনের প্রথম তলায় অবস্থিত এবং সেখানে ওঠার জন্য একটি মাত্র সিঁড়ি ব্যবহৃত হচ্ছিল। এই একটি পথই মন্দিরে প্রবেশ এবং প্রস্থানের জন্য ব্যবহৃত হওয়ায় সেখানে তীব্র ভিড়ের সৃষ্টি হয়।

 

অতিরিক্ত মানুষের চাপের মুখে, সিঁড়ির পাশে থাকা একটি লোহার রেলিং বা গ্রিল আকস্মিকভাবে ভেঙে পড়ে। এর ফলে, রেলিং ধরে থাকা বহু পুণ্যার্থী, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন নারী, প্রায় ছয় ফুট উচ্চতা থেকে নিচের কংক্রিটের ওপর এবং সিঁড়িতে থাকা অন্য ভক্তদের ওপর আছড়ে পড়েন। এই পতনের ফলে মুহূর্তের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, যা একটি ভয়াবহ পদপিষ্টের রূপ নেয়। আতঙ্কিত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

 

শ্রীকাকুলামের পুলিশ সুপার কে. ভি. মহেশ্বর রেড্ডি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, "এটি একটি দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা, যা মূলত মন্দির কর্তৃপক্ষের ভুলের কারণেই ঘটেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, রেলিংটি অত্যন্ত দুর্বলভাবে নির্মিত ছিল।" তিনি আরও জানান যে, এত বড় একটি ধর্মীয় সমাবেশের জন্য মন্দির কর্তৃপক্ষ পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো ধরনের অনুমতি নেয়নি এবং কোনো রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও আবেদন করেনি। ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত পুলিশি 'বন্দোবস্ত' না থাকায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

 

এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত নয়জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে আটজনই নারী এবং একজন ১২ বছর বয়সী কিশোর। আহতের সংখ্যা ২৫ জনেরও বেশি, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে পালসার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মন্দিরের সিঁড়িতে পুণ্যার্থীদের জুতো, পূজার সামগ্রী এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যা মুহূর্তের সেই ভয়াবহতার সাক্ষ্য বহন করছে।

 

এই মর্মান্তিক ঘটনায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স' (পূর্বে টুইটার)-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, "অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলামের কাসিবুগ্গা ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী মন্দিরে পদপিষ্টের ঘটনায় মর্মান্তিক প্রাণহানিতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। আমার হৃদয় শোকসন্তপ্ত পরিবার এবং আহতদের জন্য ব্যথিত। আমি আশা করি তারা এই কঠিন সময়ে শক্তি খুঁজে পাবেন এবং আহতরা দ্রুত আরোগ্য লাভ করবেন।"

 

রাহুল গান্ধী কেবল শোক প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি অন্ধ্র প্রদেশ সরকারকে দ্রুততার সাথে পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানান। তিনি রাজ্য সরকারকে "সহানুভূতি ও দ্রুততার" সাথে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর এবং সমস্ত প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও সহায়তা mobilize করার জন্য অনুরোধ করেন। একইসাথে, তিনি ওই অঞ্চলের কংগ্রেস নেতা ও কর্মীদের ত্রাণকার্যে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার এবং শোকাহত পরিবারগুলোকে সব ধরনের সহায়তা প্রদানের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

 

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এই ঘটনায় গভীর বেদনা প্রকাশ করেছেন। তিনি 'এক্স'-এ লিখেছেন, "শ্রীকাকুলামের ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী মন্দিরে পদপিষ্টের ঘটনায় আমি ব্যথিত। যারা তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, আমার সমবেদনা তাদের সাথে রয়েছে। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।" প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে (পিএমএনআরএফ) নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের প্রত্যেককে ৫০,০০০ টাকা করে এককালীন আর্থিক সহায়তা বা 'অনুগ্রহ রাশি' ঘোষণা করা হয়েছে।

 

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে. পি. নাড্ডা এবং জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াসহ একাধিক জাতীয় নেতা এই মর্মান্তিক প্রাণহানিতে শোক জ্ঞাপন করেছেন। অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন. চন্দ্রবাবু নাইডু এই ঘটনাকে "অত্যন্ত হৃদয়বিদারক" বলে অভিহিত করেছেন এবং গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে রাজ্যের মন্ত্রী কে. অটচান্নাইডু এবং স্থানীয় বিধায়ককে ঘটনাস্থলে গিয়ে ত্রাণ ও উদ্ধারকার্য তদারকি করার নির্দেশ দেন। মুখ্যমন্ত্রী নাইডু কর্মকর্তাদের আহতদের জন্য দ্রুত এবং সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।

 

অন্ধ্র প্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভাঙ্গালপুডি অনিতা এবং দেবোত্তর মন্ত্রী আনাম রামানারায়ণ রেড্ডি উভয়েই স্পষ্ট করেছেন যে, কাসিবুগ্গার এই ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী মন্দিরটি একটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন মন্দির এবং এটি রাজ্য সরকারের দেবোত্তর বিভাগের (Endowments Department) অন্তর্ভুক্ত নয়। মন্ত্রীরা অভিযোগ করেন, মন্দির কর্তৃপক্ষ এত বড় একটি জনসমাগমের বিষয়ে প্রশাসনকে কোনো তথ্যই দেয়নি, যার ফলে এই বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা বলেন, "একাদশী, কার্তিক মাস এবং শনিবার-এই তিনটি ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একই দিনে পড়ায় ভিড় যে অস্বাভাবিক হবে, তা প্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু মন্দির কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে।"

 

তবে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অন্ধ্র প্রদেশের রাজনীতিও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং ওয়াইএসআর কংগ্রেস পার্টির প্রধান ওয়াই. এস. জগন মোহন রেড্ডি এই দুর্ঘটনার জন্য বর্তমান চন্দ্রবাবু নাইডু সরকারের "চরম উদাসীনতা" এবং "অদক্ষতাকে" দায়ী করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, "এই ধরনের দুঃখজনক ঘটনা বারবার ঘটার পরও সরকার কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করেনি। এর আগেও তিরুপতি এবং সিংহাচলম মন্দিরে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। নিরীহ মানুষের জীবনের এই পুনরাবৃত্ত ক্ষতি চন্দ্রবাবু নাইডুর প্রশাসনের অদক্ষতাকেই প্রতিফলিত করে।"

 

ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পদপিষ্টের ঘটনা নতুন নয়। প্রায়শই অপর্যাপ্ত পরিকাঠামো, দুর্বল জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার ফলে উৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই পার্শ্ববর্তী তামিলনাড়ুতে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে পদপিষ্ট হয়ে ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

 

শ্রীকাকুলামের এই বিপর্যয় আবারও প্রমাণ করল যে, বিশেষ করে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন মন্দিরগুলো, যারা প্রায়শই সরকারি নিরাপত্তা বিধিমালা বা নজরদারির বাইরে থাকে, সেগুলো জননিরাপত্তার জন্য কত বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একটি মাত্র প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ, নির্মাণাধীন চত্বর এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় দশগুণ বেশি মানুষের ভিড়-এই সবকিছুই একটি ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল।

 

বর্তমানে, রাজ্য সরকার এই ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু এই তদন্তের ফলস্বরূপ ভবিষ্যতে ধর্মীয় স্থানগুলোতে, তা সরকারি হোক বা বেসরকারি, পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো বাস্তবসম্মত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আজকের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল কয়েকটি পরিবারের জন্যই নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য একটি গভীর বেদনার ক্ষত হয়ে রইল, যা হয়তো সামান্য সতর্কতা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সহজেই এড়ানো যেত।

 

- ANI News