তাঁর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই সুবিশাল বাজেটে বৈদেশিক ঋণের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বিভিন্ন খাতে বিশাল অঙ্কের থোক বরাদ্দ সামষ্টিক আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বাজেট অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরাও সাধারণত ঋণনির্ভর অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে ঠিক এমন সতর্কবার্তাই উচ্চারণ করে থাকেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তাঁর গঠনমূলক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন যে, সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটে একটি মানবিক অর্থনীতি গড়ার মহৎ লক্ষ্যের কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
সেখানে দেশের যুবসমাজ, সমাজের পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির মতো অত্যন্ত যুগোপযোগী ও সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে নীতিগতভাবে যথাযথ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী দিক।
তবে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, সরকারের এই চমৎকার অর্থনৈতিক নীতি ও লক্ষ্যমাত্রাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য যে সুদৃঢ় ও টেকসই আর্থিক ভিত্তির প্রয়োজন, তা প্রস্তাবিত বাজেটে দৃশ্যত অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর প্রতীয়মান হচ্ছে।
এই কাঠামোগত দুর্বলতার পেছনের অন্তর্নিহিত কারণ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বলেন, প্রস্তাবিত আর্থিক রূপরেখার ভেতরে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক ঋণ বা বিলের সংস্থান রাখা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির তুলনায় ক্রমাগত ধারদেনা করে বিশাল আকারের বাজেট বাস্তবায়নের এই প্রবণতা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
উপরন্তু, বাজেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বড় আকারের থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যেখানে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব থাকার একটি জোরালো আশঙ্কা থেকে যায়।
মূলত এই অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাহীন থোক বরাদ্দের কারণেই দেশের সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চরম দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন।
অর্থনৈতিক উদারীকরণ, মানবিক রাষ্ট্র গঠন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের যে মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা বাজেটে তুলে ধরা হয়েছে, তার চূড়ান্ত সাফল্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে এর কার্যকর, সময়োপযোগী ও দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়নের ওপর।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, কেবল নীতিগতভাবে একটি শক্তিশালী কাঠামো প্রণয়ন করলেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হবে না, বরং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা ও কাঠামোগত দৃঢ়তাও অর্জন করতে হবে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সরকার শেষ পর্যন্ত কতটা দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে এই বিশাল ঋণনির্ভর বাজেট বাস্তবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হবে, সেটিই আগামী দিনে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় ও কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে মত প্রকাশ করেন।