বৃহস্পতিবার, জুন ১১, ২০২৬
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের ৫৫তম বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম

দেশের ৫৫তম বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী
ছবি : Collected

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

 

বৃহস্পতিবার বিকেলে স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এই বাজেট পেশ করা হয়, যা বর্তমান সরকারের প্রথম এবং স্বাধীন দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট।

 

অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ, টেকসই অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণীত এই বাজেটে একদিকে যেমন ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড ঘাটতি রয়েছে, অন্যদিকে সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতি পরিচালনার জন্য রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।

 

বাজেটের বিশাল ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎসের ওপরই সমান্তরালভাবে জোর দেওয়া হয়েছে। প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির পাশাপাশি নিত্যপণ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এক লাখ বিশ হাজার কোটি টাকার বিশাল ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

 

এই বিপুল অর্থসংস্থানের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওপর ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, যার সিংহভাগই আসবে মূল্য সংযোজন কর এবং আয়কর থেকে।

 

বিশাল বাজেট ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অর্থ সংগ্রহের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতসব চ্যালেঞ্জের মাঝেও আগামী অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

 

সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে এবং দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এবারের কর কাঠামোয় ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে সিগারেট ও নিকোটিন পণ্যের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি দেশি-বিদেশি মদ, আমদানিকৃত হিমায়িত মাছ, কাজুবাদাম, প্রসাধনসামগ্রী ও নির্মাণ খাতের প্রধান উপকরণ এমএস রডের ওপর শুল্ক হার বাড়ানো হয়েছে।

 

বিপরীতে, দেশীয় ইলেকট্রনিকস শিল্পকে প্রণোদনা দিতে ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, মোবাইল ও ল্যাপটপ উৎপাদনে ভ্যাট সুবিধা কমানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কিছুটা সহজ করতে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে উৎসে কর কমিয়ে অভিন্ন শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

 

এছাড়া পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপরও শুল্ক ছাড়ের ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। এবারের বাজেটের সবচেয়ে যুগান্তকারী দিকটি হলো ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য দেশে প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি আয়কর রূপরেখা ঘোষণা।

 

এই রূপরেখা অনুযায়ী, করমুক্ত আয়সীমা বিদ্যমান তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, যা ধাপে ধাপে ২০৩০-২০৩১ করবর্ষে সাড়ে চার লাখ টাকায় গিয়ে দাঁড়াবে।

 

নারী, প্রবীণ নাগরিক, তৃতীয় লিঙ্গ, প্রতিবন্ধী এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের জন্য বিশেষ করমুক্ত সুবিধা রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে আয়বৈষম্য দূর করতে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর আয়ের আনুপাতিক হারে সর্বোচ্চ পঁয়ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

 

দীর্ঘমেয়াদি এই কর নীতির মাধ্যমে দেশের করব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল ও প্রগতিশীল করার আশা করছে সরকার। এখন সরকারের মূল পরীক্ষা হলো নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রেখে এবং ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে এই সুবিশাল ঘাটতি বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়ন করা।