আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বিদেশি বা অনিবাসী করদাতাদের যন্ত্রপাতি ভাড়া বাবদ অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান উৎসে কর কর্তনের হার পনেরো শতাংশ থেকে কমিয়ে সরাসরি সাড়ে সাত শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর এই উদ্যোগ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহকে আরও সুসংহত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।
প্রস্তাবিত এই বাজেটের রূপরেখায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশে একটি প্রকৃত শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়েই সরকার এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
বর্তমান প্রচলিত করবিধি অনুযায়ী, কোনো দেশীয় প্রতিষ্ঠান যদি বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা আধুনিক প্রযুক্তি ভাড়ায় বা ইজারা হিসেবে নিয়ে আসে, তবে মূল্য পরিশোধের সময় তাদের পনেরো শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখতে হয়।
প্রস্তাবিত এই নতুন নিয়মটি কার্যকর হলে করের এই বিশাল বোঝা এক ধাক্কায় অর্ধেকে নেমে আসবে। এর ফলে দেশীয় উদ্যোক্তা এবং দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগকারীদের জন্য সার্বিক ব্যবসায়িক পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন, নির্মাণকাজ, টেলিযোগাযোগ এবং বিভিন্ন উৎপাদনশীল শিল্পের সাথে জড়িত অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ভারী যন্ত্রপাতি, বিশেষায়িত মেশিনারি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ভাড়ায় নিয়ে থাকে।
বাস্তবসম্মত কারণে অনেক সময় বড় মাপের মেগা বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোতে সরাসরি বিপুল অর্থ ব্যয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি একেবারে কিনে আনার চেয়ে সাময়িকভাবে ভাড়ায় আনা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও যৌক্তিক হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু বিদ্যমান উচ্চ করহারের কারণে এতদিন এই খাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের আর্থিক ব্যয় অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যেত, যা অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াত।
উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে আধুনিক প্রযুক্তির এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা মাথায় রেখেই উৎসে কর কমানোর এই সময়োচিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন এসব অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি গ্রহণের ব্যয় অনেকাংশে কমে আসবে, তেমনি অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে বিদেশি উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারও বহুগুণে উৎসাহিত হবে।
করহার কমানোর এই সুচিন্তিত ও কৌশলগত সিদ্ধান্তটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিদেশি সেবা ও প্রযুক্তি সরবরাহকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ বাজার হিসেবে নতুন করে বিবেচিত হবে।
দীর্ঘমেয়াদে সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কাঠামোগত উন্নয়নের ধারাকে আরও বেশি মজবুত ও টেকসই করবে বলে আশা করা হচ্ছে।