তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং ছাত্র-জনতার অসামান্য আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে নতুন গণতান্ত্রিক পরিবেশের সূচনা হয়েছে, সেখানে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী।
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার ঘারুয়া ইউনিয়নের সাউতিকান্দা গ্রামে এক ব্যক্তিগত সফরে গিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তাঁর এই সুচিন্তিত বক্তব্য এমন এক সময়ে প্রদান করা হলো, যখন দেশের আপামর জনসাধারণ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চার নিশ্চয়তা খুঁজছে।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত এই নতুন সংসদের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার পারদ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক উঁচুতে অবস্থান করছে।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে, বর্তমান আইনসভায় জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার এবং সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ আরও অনেক বেশি উন্মুক্ত ও বিস্তৃত করা হয়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সব সময়ই এ দেশের সাধারণ মানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও সোনালি ভবিষ্যতের প্রধান প্রতীকরূপে বিবেচিত হয়ে আসছে।
তবে, তিনি অকপটে এবং সাহসিকতার সঙ্গে স্বীকার করেন যে, অতীতের বেশ কয়েকটি নির্বাচিত সংসদ এবং তাদের বিতর্কিত কার্যপ্রণালী নিয়ে সাধারণ জনগণের মনে নানা ধরনের যুক্তিসংগত প্রশ্ন, গভীর সংশয় ও বিস্তর সমালোচনা ছিল।
অতীত সরকারগুলোর সময়ে সংসদের কার্যকারিতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে যে চরম আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সংসদ সেই নেতিবাচক ও কলুষিত ধারা থেকে সম্পূর্ণরূপে বেরিয়ে এসে জনমানুষের প্রকৃত আস্থার জায়গা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বদ্ধপরিকর বলে তিনি জানান।
আগামীর আধুনিক বাংলাদেশ ঠিক কোন পথে অগ্রসর হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিগুলো কীভাবে নির্ধারিত হবে, সে বিষয়ে বর্তমান সংসদ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, গঠনমূলক ও যুগান্তকারী দিকনির্দেশনা প্রদান করবে বলে ডেপুটি স্পিকার গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি মনে করেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্যই হলো সরকারি ও বিরোধী দলের পরমতসহিষ্ণুতা এবং গঠনমূলক সহাবস্থান। এই প্রেক্ষাপটে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সংসদে সরকারি দল এবং বিরোধী দল উভয়েরই স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি কার্যকর রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
দেশের সব ধরনের রাজনৈতিক ও দলীয় সংকীর্ণতা এবং ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় সংসদকে রাষ্ট্র ও সর্বস্তরের জনগণের কল্যাণে আরও বেশি কার্যকর, অর্থবহ এবং গতিশীল করার জন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একযোগে কাজ করে যাচ্ছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এই সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিগুলোকে আরও বেশি সুদৃঢ় ও টেকসই করবে বলে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় শহীদদের স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের সেই উত্তাল ও সংগ্রামমুখর দিনগুলোতে দেশের অকুতোভয় ছাত্র-জনতা যে অকাতর রক্ত বিলিয়ে দিয়েছেন এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে যে অসামান্য আত্মত্যাগের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা বর্তমান সংসদের অন্যতম প্রধান নৈতিক ও পবিত্র দায়িত্ব।
যারা দেশের লুণ্ঠিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে নিজেদের মূল্যবান জীবন হাসিমুখে উৎসর্গ করেছেন, তাদের সেই মহান আত্মত্যাগের প্রকৃত প্রতিফলন রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি পদক্ষেপে ও প্রণীত আইনে নিশ্চিত করার মহান লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার ও সংসদ কাজ করে যাচ্ছে।
শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করার কোনো বিকল্প নেই বলেও তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় আয়োজিত এই অনানুষ্ঠানিক অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মতবিনিময়কালে স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
সেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর-৪ নির্বাচনী আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম খান, যিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছে বাবুল নামেই সমধিক পরিচিত। এছাড়াও, এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর জেলার সুযোগ্য জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম, ভাঙ্গা উপজেলা জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সম্মানিত সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন, দলটির সাধারণ সম্পাদক মো. আইয়ুব মোল্লা এবং ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানসহ আরও অনেক স্থানীয় গণ্যমান্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
জাতীয় সংসদের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্তাব্যক্তির এমন বাস্তবসম্মত, খোলামেলা ও প্রতিশ্রুতিশীল বক্তব্য স্থানীয় জনগণ এবং উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক সাড়া ফেলেছে, যা আগামী দিনের সুস্থ রাজনীতির জন্য একটি শুভলক্ষণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।