আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম এমন চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। রোববার নিজ কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এই ঐতিহাসিক ও স্পর্শকাতর ঘটনার আইনি পদক্ষেপ এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মানদণ্ডে এই ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া এখন দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত মর্মান্তিক ওই ঘটনাকে একটি পদ্ধতিগত ও সুশৃঙ্খল অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রধান কৌঁসুলি। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উল্লেখ করেন যে, এই ব্যাপক ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের পেছনে তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি দায়বদ্ধতা রয়েছে।
সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। সেই সময় যখন ধর্ম অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা অহিংস ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই ইসলামী সংগঠনটিকে চিরতরে স্তব্ধ ও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য একটি ভয়ংকর নীলনকশা প্রণয়ন করা হয়।
সেই অশুভ পরিকল্পনারই চূড়ান্ত ও রক্তক্ষয়ী বহিঃপ্রকাশ ছিল শাপলা চত্বরের রাতের অন্ধকারের সেই ভয়াবহ ও অমানবিক অভিযান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব তদন্ত সংস্থা দীর্ঘ সময় ধরে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত পরিচালনা করেছে।
তদন্তের কাজ শেষে তারা এরই মধ্যে প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে একটি বিস্তারিত খসড়া প্রতিবেদন দাখিল করতে সক্ষম হয়েছে। এই বিষয়ে আমিনুল ইসলাম জানান, দাখিলকৃত প্রতিবেদনটি এখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা এবং চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিচার প্রক্রিয়া যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড অনুযায়ী হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই নিবিড় পর্যালোচনা চালানো হচ্ছে। প্রকৃত অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে না যায় এবং তারা যেন ন্যায়বিচারের সম্মুখীন হয়, সেই লক্ষ্যেই ট্রাইব্যুনাল নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবেই হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে খসড়া প্রতিবেদনটির বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং অতি শিগগিরই একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়া যাবে বলে ট্রাইব্যুনাল অত্যন্ত আশাবাদী।
এই চাঞ্চল্যকর মামলার আসামিদের তালিকায় সুনির্দিষ্টভাবে কাদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সাংবাদিকদের এমন কৌতূহলী প্রশ্নের জবাবে প্রধান কৌঁসুলি অত্যন্ত পেশাদারি ও আইনি সতর্কতার সঙ্গে মন্তব্য করেন।
তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান প্রতিবেদনটি যেহেতু এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে, তাই চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগে আসামিদের তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা আইনত সমীচীন নয়।
তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, সদ্য ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের প্রধান নির্দেশদাতা ও আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রাথমিক প্রমাণ ও প্রতিবেদন পাওয়া গেছে।
শেখ হাসিনা ছাড়াও সেই সময়কার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশের সাবেক প্রধান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও খসড়া প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। এই সমস্ত অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।
আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে খসড়া প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষে আসামিদের নামের তালিকায় কিছু সংযোজন বা বিয়োজন হওয়ার আইনি সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। প্রধান কৌঁসুলি জানান, হেফাজতে ইসলামের নেতারাই হলেন সেই বিভীষিকাময় রাতের জ্বলন্ত ও প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
তারা সেই ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল। তাই তদন্তের বিষয়ে তাদের যদি কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য বা পর্যবেক্ষণ থাকে, তবে ট্রাইব্যুনাল তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেবে। তবে শেষ পর্যন্ত কে আসামি হবেন এবং কে হবেন না, তা ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিলের পরেই দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্পষ্টভাবে জানতে পারবে।
দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে থাকা নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও এদিন আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলেন প্রধান কৌঁসুলি। তিনি জানান, শাপলা চত্বরের সেই রাতের নারকীয় ঘটনায় নিহত অন্তত ৬১ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা তাদের হাতে এসেছে।
এই সংগৃহীত তালিকার মধ্যে এরই মধ্যে ৫৮ জন নিহতের পরিচয় নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি তিনজনের পরিচয় শনাক্তের কাজ এখনো চলমান রয়েছে, যা শিগগিরই সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
এর আগে, রোববার সকালে হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির আব্দুল হামিদের নেতৃত্বে সংগঠনটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আগমন করে।
এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলামের প্রথম সারির নেতা আল্লামা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজহার এবং মুফতি মীর ইদ্রিসসহ অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। তারা ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে আইনি বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন এবং ন্যায়বিচারের প্রতি তাদের দৃঢ় আস্থার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।