শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিতে অংশীদারত্ব সম্প্রসারণে চীনের গভীর আগ্রহ প্রকাশ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২২ পিএম

বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিতে অংশীদারত্ব সম্প্রসারণে চীনের গভীর আগ্রহ প্রকাশ
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি খাতে নিবিড় সহযোগিতা বৃদ্ধির জোরালো আগ্রহ প্রকাশ করেছে এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন।

 

একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ও বহুল আলোচিত রোহিঙ্গা সংকটের একটি কার্যকর এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানেও বাংলাদেশের পাশে থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে বেইজিং। শনিবার রাজধানী ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের পদ্মা হলে ‘বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্ব দীর্ঘজীবী হোক’ শীর্ষক এক বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তথ্যগুলো তুলে ধরেন।

 

বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানাবিধ দিক ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্রমবিকাশের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করে মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুগভীর এবং সময়ের পরিক্রমায় তা একটি শক্তিশালী, টেকসই ও বহুমাত্রিক রূপ লাভ করেছে।

 

তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্কের একটি অত্যন্ত সুদৃঢ় ও মজবুত ভিত্তি রচিত হয়েছিল। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফল চীন সফর এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে এবং আস্থার জায়গাটিকে আরও প্রশস্ত করতে একটি যুগান্তকারী ও অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করেছে।

 

বর্তমানে এই সম্পর্ক কেবল আনুষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই; বরং শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নত প্রযুক্তির আদান-প্রদান এবং দুই দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক ও নিবিড় যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এর অভূতপূর্ব বিস্তৃতি ঘটেছে।

 

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞান, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি এবং সার্বিক অর্থনীতিতে চীনের অভাবনীয় ও ঈর্ষণীয় অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য একটি বিশাল ও সম্ভাবনাময় সুযোগ।

 

চীনের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিপুল বিনিয়োগকে যদি বাংলাদেশ যথাযথ ও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের গতিশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। অসংখ্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বর্তমানে চীনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলছেন।

 

পাশাপাশি দেশের অনেক তরুণ ও উদ্যোমী উদ্যোক্তা চীন থেকে আধুনিক প্রযুক্তি দেশে এনে ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করছেন, যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

 

রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির সঙ্গে চীনের ক্ষমতাসীন দল কমিউনিস্ট পার্টির দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থার কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জানান যে, অতীতে দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকাকালেও বিএনপি সর্বদা চীনের সঙ্গে একটি নিরবচ্ছিন্ন ও গঠনমূলক রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিল।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি সূক্ষ্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ দিক নির্দেশ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যান্য সকল পরাশক্তি ও উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গেও একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ এবং পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা সমানভাবে অপরিহার্য।

 

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেই বাংলাদেশকে তার নিজস্ব উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে বলে তিনি মনে করেন। উক্ত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বর্তমান সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান ও টেকসই করতে চীন ভবিষ্যতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারে।

 

তিনি দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, রপ্তানি খাতের প্রসার, প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সড়ক যোগাযোগের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে চীনের অত্যন্ত সক্রিয় এবং দৃশ্যমান ভূমিকার ওপর বিশেষভাবে জোর দেন।

 

অন্যদিকে, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের মান্যবর রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন তার বক্তব্যে অত্যন্ত সাবলীলভাবে জানান যে, বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান ব্যবসা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধি আরও ব্যাপকভাবে বাড়াতে চীন আন্তরিকভাবে আগ্রহী।

 

তিনি দুই দেশের মধ্যকার সব ধরনের গঠনমূলক দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করার পাশাপাশি রোহিঙ্গা মানবসৃষ্ট সংকট নিরসনে চীনের পক্ষ থেকে কার্যকর ও জোরালো সহযোগিতার আশ্বাসটি পুনরায় নিশ্চিত করেন।

 

বাংলাদেশ-চীন ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান সভাপতি নাজমুল হক নান্নুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বর্তমান সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।

 

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলেই দুই দেশের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ ও উন্নয়নমূলক সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে আরও নিবিড় ও সুদৃঢ় হবে বলে জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেন।