শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বর্তমান সরকারকেও মেনে নেওয়া হবে না

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বর্তমান সরকারকেও মেনে নেওয়া হবে না
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং শাসনব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের মাঝে ক্ষমতাসীনদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

 

তিনি স্পষ্টভাবে ও দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন যে, সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক গণভোটে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ যে ইতিবাচক রায় প্রদান করেছে, তা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই উপেক্ষা করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

 

যদি এই গণভোটের রায় এবং জন-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, তবে তাদের শাসনকেও দেশের সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণ অবৈধ হিসেবে গণ্য করে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করবে।

 

শনিবার বিকেলে বরিশালের ঐতিহাসিক হেমায়েত উদ্দিন ঈদগাহ ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল ও জনবহুল বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির আসন থেকে তিনি এই কড়া রাজনৈতিক বার্তা প্রদান করেন।

 

গণভোটের মাধ্যমে প্রাপ্ত জনগণের সুস্পষ্ট রায়ের পূর্ণাঙ্গ ও দ্রুত বাস্তবায়ন, দেশজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জনদুর্ভোগ লাঘব করা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ চরমভাবে অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ দক্ষিণাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট দাবিতে এই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

 

হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে দেওয়া দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সাংবিধানিক কাঠামোগত সংকট এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের গৃহীত বিভিন্ন বিতর্কিত পদক্ষেপের তীব্র ও গঠনমূলক সমালোচনা করেন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ এই নেতা।

 

বক্তব্যে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলকে সরাসরি ইঙ্গিত করে এবং তাদের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর প্রথমবার ক্ষমতায় এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল, যার চড়া রাজনৈতিক মাশুল সমগ্র জাতিকে পরবর্তীতে দিতে হয়েছে।

 

পুনরায় সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বিরোধী দলগুলো কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত বা সহিংসতা চায় না, বরং তারা সবাই মিলে একটি নতুন ও বৈষম্যহীন দেশ গড়ার কাজে সম্মিলিতভাবে অংশ নিতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী।

 

কিন্তু ক্ষমতাসীনরা যদি তাদের একগুঁয়েমি ও রাজনৈতিক কূটকৌশলের মাধ্যমে বিরোধী দলগুলোকে ধাক্কা দিয়ে রাজপথে নামতে বাধ্য করে, তবে সেই সৃষ্ট গণআন্দোলনের দাবানলে অনেক কিছুই সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যেতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

 

সাম্প্রতিক গণভোটের প্রসঙ্গটি গুরুত্বের সাথে টেনে তিনি উপস্থিত জনতাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশের সত্তর ভাগ মানুষ অতীত রাজনীতির পতন এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন শাসনব্যবস্থার পক্ষে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের রায় দিয়েছে।

 

কিন্তু ক্ষমতাসীনরা কৌশল ও কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় বসার পর জনসমক্ষে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বেমালুম বিস্মৃত হয়েছে। তিনি জোরালো অভিযোগ করেন যে, যারা একসময় রাষ্ট্র মেরামতের জন্য ৩১ দফা সংস্কারের কথা বলেছিল, তারা এখন সংস্কারের প্রকৃত সংজ্ঞা নিয়েই জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

 

জাতীয় সংসদে বিতর্কিত উপায়ে ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’ এবং পরবর্তীতে জনরোষের মুখে নাম পরিবর্তন করে ‘বিশেষ কমিটি’ গঠনের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। জামায়াত আমির এটিকে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং বিদ্যমান সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধির সুস্পষ্ট পরিপন্থী বলে আখ্যায়িত করেন।

 

সাধারণ জনগণের সাথে আর কোনো ধরনের ছলচাতুরী, ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার পথ অবলম্বন না করার জন্য তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলের কালো দিনগুলোর কথা স্মরণ করে জামায়াত আমির বলেন, ২০০৬ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ উনিশটি বছর এদেশের মুক্তিকামী মানুষ যে অবর্ণনীয় জুলুম, গুম, গোপন বন্দিশালা বা আয়নাঘরের আতঙ্ক এবং নির্মম হত্যার শিকার হয়েছে, তারই চূড়ান্ত পরিণতি ছিল চব্বিশের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান।

 

তিনি বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, পূর্ববর্তী স্বৈরাচার সরকারের আমলে তৈরি করা এবং তাদের শাসনকে দীর্ঘায়িত করা ১৩৩টি বিতর্কিত অধ্যাদেশ এখনো বাতিল না করে বহাল রাখা জাতির সাথে চরম ও ক্ষমার অযোগ্য বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

 

তিনি বর্তমান সরকারকে তাদের পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অন্ধভাবে অনুসরণ করে ছদ্মবেশী স্বৈরাচার বা কৃত্রিম শাসক হয়ে ওঠার অপচেষ্টা থেকে দ্রুত বিরত থাকার সৎ পরামর্শ দেন। কারণ, দেশের অকুতোভয় ছাত্র-জনতা যখন প্রাণ দিয়ে আসল স্বৈরাচারকেই দেশ থেকে চিরতরে উৎখাত করেছে, তখন কোনো নকল বা ছদ্মবেশী স্বৈরাচারকে তারা এক মুহূর্তের জন্যও মেনে নেবে না।

 

তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের একেবারে শেষাংশে তিনি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের অগণিত শহীদ এবং বীর যোদ্ধাদের অসামান্য অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের সাথে স্মরণ করেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস অবশ্যই আমাদের পরম অহংকার এবং সোনালী অতীত, তবে একাত্তরের দোহাই দিয়ে বা আড়ালে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত ইতিহাসকে কোনোভাবেই ম্লান, অবমূল্যায়ন বা ধামাচাপা দেওয়া যাবে না।

 

জুলাই বিপ্লবের প্রতিটি শহীদ এবং আহত গাজীকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত করার জোর দাবি জানান তিনি। একই সাথে, নতুন প্রজন্মের এই বীরদের সাথে আর কোনো রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা চাতুর্য না করার জন্য ক্ষমতাসীনদের প্রতি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই প্রজন্ম ইতোমধ্যে পরীক্ষিত এবং বিজয়ী, তাদের সাথে প্রতারণা করা হলে এদেশের সাধারণ মানুষ কাউকেই ছেড়ে কথা বলবে না।