দেশে প্রথমবারের মতো অত্যন্ত সফলভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র বা ভেন্টিলেটর এবং উচ্চ-প্রবাহের অক্সিজেন সরবরাহকারী যন্ত্র। চিকিৎসা খাতে যুগান্তকারী এই উদ্ভাবনের নেপথ্যে থাকা কারিগরদের মেধা ও মননের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শুধু মৌখিক প্রশংসাই নয়, উদ্ভাবিত এই জীবনরক্ষাকারী সংবেদনশীল যন্ত্র দুটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে তোলা এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপকভাবে বাজারজাত করার লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আনুষঙ্গিক ও নীতিগত সহযোগিতা প্রদানের সুস্পষ্ট ও দৃঢ় আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ পর্যালোচনা ও মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী এই প্রশংসা ও সহায়তার আশ্বাস ব্যক্ত করেন। সভার বিস্তারিত তথ্য ও আলোচ্যসূচি গণমাধ্যমের কর্মীদের কাছে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু।
তিনি জানান, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সভায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও গবেষকগণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করা এই দুটি চিকিৎসা যন্ত্রের সার্বিক প্রযুক্তিগত কার্যকারিতা, ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং জাতীয় স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতিতে এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাবের কথা সবিস্তারে উপস্থাপন করেন।
যন্ত্র দুটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতার উপস্থাপনা পর্যবেক্ষণের পর প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে বলেন, দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে আধুনিক, সময়োপযোগী ও লাগসই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে বর্তমান সরকার উন্নততর গবেষণা এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করছে।
যেকোনো নতুন চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অনুমোদনের পূর্বে প্রয়োজনীয় নিখুঁত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা, গুণগত মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা এবং সর্বোপরি বাণিজ্যিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকার তার সর্বাত্মক প্রশাসনিক ও আর্থিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে তিনি সভায় উল্লেখ করেন।
সভায় উপস্থিত উদ্ভাবক ও বিশেষজ্ঞদের তরফ থেকে জানানো হয় যে, দেশের স্বনামধন্য দুটি পৃথক বিশেষজ্ঞ দলের দীর্ঘদিনের নিরলস পরিশ্রম ও নিবিড় গবেষণার চূড়ান্ত ফসল হিসেবে এই ভেন্টিলেটর এবং উচ্চ-প্রবাহের অক্সিজেন যন্ত্রটি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
বর্তমানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যন্ত্র দুটির চূড়ান্ত অনুমোদন লাভের আইনি ও কারিগরি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রয়োজনীয় ক্লিনিক্যাল বা চিকিৎসায় প্রয়োগ সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এগুলো দেশের সকল স্তরের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীদের সেবায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা যাবে।
একই সাথে, গুণগত মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সমকক্ষ হওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক বাজারেও এই চিকিৎসা সরঞ্জাম রপ্তানির এক বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, সম্পূর্ণ দেশীয় কাঁচামাল ও প্রযুক্তিতে উৎপাদিত হওয়ায় বিদেশ থেকে আমদানিকৃত সমজাতীয় যন্ত্রের তুলনায় এই যন্ত্র দুটি অনেক কম খরচে এবং সুলভ মূল্যে বাজারজাত করা সম্ভবপর হবে।
এর ফলে সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, যা দেশের আপামর সাধারণ মানুষের জন্য আধুনিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও বেশি সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী করে তুলতে অনন্য ভূমিকা পালন করবে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র বা ভেন্টিলেটর মেশিনটি মূলত গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের জটিলতায় আক্রান্ত এবং সংকটাপন্ন রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি অত্যাবশ্যকীয় জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম।
মানুষের জীবন-মরণের স্পর্শকাতর প্রশ্ন জড়িত থাকায় এই সংবেদনশীল যন্ত্রটির চূড়ান্ত সুরক্ষা, শতভাগ নিখুঁত কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আরও বিস্তৃত ও নিবিড় পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
অন্যদিকে, উদ্ভাবিত উচ্চ-প্রবাহের অক্সিজেন যন্ত্রটি শ্বাসতন্ত্রের অপেক্ষাকৃত সাধারণ সমস্যাজনিত রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসায় অত্যন্ত ফলপ্রসূভাবে ব্যবহার উপযোগী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
দেশীয় গবেষকদের তৈরি এই অত্যাধুনিক যন্ত্রটির অন্যতম প্রধান ও অভাবনীয় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি পরিচালনার জন্য সরাসরি কোনো নিরবচ্ছিন্ন বৈদ্যুতিক সংযোগের একেবারেই প্রয়োজন হয় না।
ফলে, দেশের যে সকল প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে এখনও বিদ্যুৎ সুবিধা পুরোপুরি পৌঁছায়নি কিংবা আকস্মিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মতো জরুরি ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে এটি মুমূর্ষু রোগীর জন্য আক্ষরিক অর্থেই আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।
এমনকি, সংকটাপন্ন কোনো রোগীকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবহনের সময় চলন্ত অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেও এটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করে রোগীর অমূল্য জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।
পর্যালোচনা সভায় অংশগ্রহণকারী সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞগণ দৃঢ়তার সাথে এই মত প্রকাশ করেন যে, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হওয়া এই দুটি অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা যন্ত্র যদি সফলভাবে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন এবং দেশের হাসপাতালগুলোতে ব্যবহার শুরু করা যায়, তবে চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের যে চরম নির্ভরশীলতা রয়েছে, তা বহুলংশে কমে আসবে।
এটি উন্নত চিকিৎসা ক্ষেত্রে দেশের স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে ইতিহাসে পরিগণিত হবে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পর্যালোচনা সভায় অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রো-উপাচার্য ড. মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিকিৎসক ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ এবং প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-১ ডা. মামুন শিবলীসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের অন্যান্য নীতিনির্ধারকবৃন্দ।