শুক্রবার, নভেম্বর ৬, ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুমিল্লায় পুলিশ সদস্যদের ভুয়া ভেবে শিক্ষার্থীদের মারধর

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:০০ পিএম

কুমিল্লায় পুলিশ সদস্যদের ভুয়া ভেবে শিক্ষার্থীদের মারধর
ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা শহরের পুলিশ লাইন ও সরকারি মহিলা কলেজ সংলগ্ন এলাকায় বৃহস্পতিবার রাতে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার জন্ম হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের কাছে বৈধ পরিচয়পত্র না থাকায় তাদের ভুয়া পুলিশ সন্দেহে মারধর করে বাসে তুলে নিয়ে গেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের মানদণ্ডে বিচার করলে, এই ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ ভুল বোঝাবুঝির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট এবং আইন হাতে তুলে নেওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতার দিকেও ইঙ্গিত করে।

 

এই ঘটনায় কোতোয়ালি মডেল থানার দুজন পুলিশ সদস্য এবং তাদের একজন তথ্যদাতা আহত ও লাঞ্ছিত হয়েছেন। ঘটনার সূত্রপাত হয় ৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের দুজন শিক্ষার্থী, সিয়াম এবং অর্প, তাদের প্রতিদিনের টিউশনি শেষে নিজ গন্তব্যে ফেরার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

 

তারা যখন বাস ধরার উদ্দেশ্যে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন, ঠিক তখনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তিনজন ব্যক্তি তাদের পথ রোধ করেন। পুলিশি তল্লাশির নামে ওই শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়।

 

একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে সিয়াম ও অর্প ওই ব্যক্তিদের কাছে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র দেখতে চান। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়কর বিষয় হলো, কর্তব্যরত অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও ওই ব্যক্তিরা তাদের কোনো বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন।

 

পরিচয়পত্র দেখাতে না পারার এই ব্যর্থতাই মূলত সন্দেহের বীজ বপন করে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভুয়া পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ছিনতাই, অপহরণ ও চাঁদাবাজির বেশ কিছু ঘটনা ঘটার কারণে শিক্ষার্থীদের মনে তীব্র সন্দেহের সৃষ্টি হয়।

 

তারা ধরে নেন যে, তল্লাশির নামে তাদের হয়রানি করতে আসা এই ব্যক্তিরা আসলে প্রতারক চক্রের সদস্য। এই সন্দেহের বশবর্তী হয়ে ওই দুই শিক্ষার্থী যখন প্রতিবাদ শুরু করেন, তখন সেখানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও এসে জড়ো হন।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস থেকে নেমে আসা একদল ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী মুহূর্তের মধ্যেই একটি উচ্ছৃঙ্খল জনতায় পরিণত হন। তারা কোনো প্রকার আইনি যাচাই-বাছাই বা থানায় যোগাযোগের চেষ্টা না করেই ওই তিন ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে শুরু করেন।

 

পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ওই দুই পুলিশ সদস্য এবং তাদের তথ্যদাতাকে মারতে মারতে টেনেহিঁচড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে তুলে নেন। এটি ছিল এক ধরনের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া বা আইনি ভাষায় যাকে এক প্রকার অপহরণের সমতুল্য বলা যেতে পারে, যদিও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে সোপর্দ করা।

 

বাসে তোলার পর তাদের সরাসরি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কার্যালয়ে তাদের উপস্থিত করা হয়। একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের এভাবে মারধর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য জনমনে ব্যাপক বিস্ময় ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

প্রক্টরের কার্যালয়ে পৌঁছানোর পর এক থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তা, শিক্ষক, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত হন। সবার উপস্থিতিতে যখন ওই তিন ব্যক্তির পরিচয় নিবিড়ভাবে যাচাই করা হয়, তখন অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর একটি সত্য বেরিয়ে আসে।

 

জানা যায়, মারধরের শিকার ওই ব্যক্তিরা কোনো ভুয়া পুলিশ ছিলেন না। তারা হলেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় কর্মরত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শ্যামল সাহা, কনস্টেবল মোহাম্মদ হানিফ এবং তাদের সঙ্গে থাকা পুলিশের একজন স্থানীয় তথ্যদাতা বা সোর্স যার নাম জাহিদ।

 

পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পুরো পরিস্থিতি একটি ভিন্ন রূপ ধারণ করে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা ও বক্তব্য শোনার পর্ব শুরু হয়। মারধর ও লাঞ্ছনার শিকার সহকারী উপপরিদর্শক শ্যামল সাহা তার বক্তব্যে ওই রাতের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান যে, তারা কেবল দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ওই দুই শিক্ষার্থীর পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। যখন শিক্ষার্থীরা নিজেদের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দেন, তখন পুলিশ সদস্যরা তাদের ছেড়ে দেন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত এই তল্লাশির জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখও প্রকাশ করেন।

 

শ্যামল সাহা আরও স্পষ্ট করেন যে, তাদের কাছে সে সময় পরিচয়পত্র না থাকলেও পুলিশের ব্যবহৃত বেতার যন্ত্র বা ওয়াকিটকি এবং হাতকড়া প্রদর্শন করা হয়েছিল। এমনকি, শিক্ষার্থীদের সন্দেহ দূর করার জন্য কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে পরিচয় নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।

 

কিন্তু উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা কোনো যুক্তিতর্ক শুনতে রাজি ছিলেন না। তারা মুহূর্তের মধ্যে একটি ভীড় তৈরি করে পুলিশ সদস্যদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যান। এই স্পর্শকাতর ঘটনাটির বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসাইন অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ এবং বস্তুনিষ্ঠ একটি বক্তব্য প্রদান করেন।

 

তিনি স্বীকার করেন যে, পুলিশের ওই দলটি শিক্ষার্থীদের তল্লাশি করার চেষ্টা করেছিল এবং শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে তারা পরিচয়পত্র দেখাতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট থানার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও পরিচয়পত্র না থাকার এই গাফিলতির বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছে।

 

প্রক্টর মহোদয় বলেন, এই পরিচয়পত্র না থাকাকে কেন্দ্র করেই মূলত দুই পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডার সূত্রপাত হয়। তবে তিনি শিক্ষার্থীদের আচরণেরও তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, শিক্ষার্থীদের সন্দেহ হলে তারা বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট থানাকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করতে পারতেন।

 

এভাবে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে জোরপূর্বক ক্যাম্পাসে ধরে আনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। একইসঙ্গে, পুলিশ সদস্যদেরও দায়িত্ব পালনের সময় নিয়ম অনুযায়ী পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা উচিত ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। অর্থাৎ, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য উভয় পক্ষেরই দায়িত্বহীনতা এবং ঘাটতি রয়েছে।

 

ঘটনাটির আইনি ও সামাজিক দিক নিয়ে জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তায়িন বিল্লাহ ফেরদৌস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে উল্লেখ করেন যে, পরিচয় নিয়ে কোনো সন্দেহ তৈরি হলে ঘটনাস্থল থেকেই জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে অথবা সরাসরি থানায় যোগাযোগ করে মুহূর্তের মধ্যেই সত্যতা যাচাই করা সম্ভব ছিল।

 

কিন্তু তা না করে, বাসে করে পুলিশ সদস্যদের ক্যাম্পাসে তুলে নিয়ে আসা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, গত ৫ আগস্টের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার দ্বারা বিচার করার একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, এই ঘটনাটি তারই একটি ধারাবাহিকতা।

 

একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে এই ধরনের প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সাধারণ নাগরিক ও শিক্ষার্থী সমাজকে অবশ্যই এই ক্ষতিকর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

 

পুলিশের নিয়মাবলি অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র দৃশ্যমান রাখা বাধ্যতামূলক। এটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রধান মাধ্যম। এই ঘটনায় কোতোয়ালি থানার পুলিশ সদস্যদের পরিচয়পত্র না থাকা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার ঘাটতি প্রকাশ করে।

 

অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়াও ছিল চরম আক্রমণাত্মক। সন্দেহভাজন কাউকে আটক করলে তাকে নিকটস্থ থানায় হস্তান্তর করাই আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা সুস্থ সমাজের প্রতিচ্ছবি নয়।

 

পরিশেষে, দীর্ঘ আলোচনার পর উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পুলিশ পরিচয়পত্র না রাখার ভুল স্বীকার করেছে এবং শিক্ষার্থীরাও নিজেদের ভুল অনুধাবন করেছেন। একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত হলেও, এটি সমাজের জন্য সতর্কবার্তা।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদারিত্ব দেখাতে হবে, আর নাগরিকদের আইন হাতে তুলে নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, আইনের শাসন নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রের নয়, সমাজের প্রতিটি নাগরিকেরও।