ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অত্যন্ত জোরালোভাবে জানিয়েছে যে, একটি নির্দিষ্ট ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক, ভীতি এবং নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করার হীন উদ্দেশ্যেই এই ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ পরিচালনা করছে।
দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই রাজধানীর বুকে এই ধরনের সহিংসতা চালানো হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন।
রোববার, ৮ নভেম্বর রাজধানীর মিন্টো রোডে অবস্থিত ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্যগুলো গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্পষ্ট করে দেন যে, পুলিশ বাহিনী এই ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
সাংবাদিকদের নানামুখী ও তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জবাবে তিনি সাম্প্রতিক এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনের কারণ, পুলিশের গৃহীত পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিকল্পনার একটি বিশদ ও সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেন।
সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাগুলোর বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, রাজধানীতে ঘটে যাওয়া ককটেল বিস্ফোরণ ও যাত্রীবাহী যানবাহনে অগ্নিসংযোগের প্রতিটি ঘটনা পুলিশ অত্যন্ত নিবিড়, সতর্ক এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
এই ঘটনাগুলোর পেছনে কারা জড়িত, তাদের নির্দেশদাতা কারা এবং এর অর্থের জোগান কোথা থেকে আসছে, তা উদ্ঘাটন করতে পুলিশের একাধিক চৌকস দল নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি অত্যন্ত স্বস্তির সঙ্গে জানান যে, পুলিশের ধারাবাহিক ও সাঁড়াশি অভিযানের ফলে ইতিমধ্যে এসব ভয়াবহ নাশকতার ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বেশ কয়েকজন অপরাধীকে সফলভাবে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গ্রেপ্তারকৃত এই ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পুলিশ বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে। পুলিশ গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে যে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এমন ব্যক্তি রয়েছে, যারা ইতিপূর্বে রাষ্ট্র কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন উগ্রপন্থি সংগঠন এবং তাদের সমমনা বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করত।
নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের এহেন অপতৎপরতা প্রমাণ করে যে, তারা পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ও আইনতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর আঘাত হানার অপচেষ্টা লিপ্ত হয়েছে।
পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় জানান যে, সার্বিক বিষয়, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং গোয়েন্দা তথ্যগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে এটি একেবারে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, একটি সুনির্দিষ্ট ও চিহ্নিত গোষ্ঠী সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাধারণ নাগরিকদের মাঝে আতঙ্ক ছড়াতে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতেই এই কাপুরুষোচিত কাজগুলো করছে।
রাজধানীর বিশাল জনসংখ্যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে অপারেশনাল কার্যক্রম এবং পুলিশি টহল ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রাপ্ত আগাম তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রাজধানীর প্রতিটি স্পর্শকাতর এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাস টার্মিনাল এবং জনসমাগমপূর্ণ স্থানগুলোতে বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে মোকাবিলা করে জনগণের মন থেকে আতঙ্ক দূর করতে ডিএমপির মোবাইল পার্টি এবং পিকেট ডিউটির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।
একই সঙ্গে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারিও অব্যাহত রয়েছে, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নতুন কোনো নাশকতার ছক কষতে না পারে। প্রেস ব্রিফিং চলাকালে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, এই প্রাণঘাতী ককটেল বা বিস্ফোরক তৈরির কাঁচামালগুলো অপরাধীরা কোথা থেকে সংগ্রহ করছে এবং কোথায় বসে এগুলো তৈরি করা হচ্ছে।
এই প্রশ্নের জবাবে উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, এর আগেও ককটেল তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম, কাঁচামাল ও মারাত্মক বিস্ফোরকদ্রব্যসহ বেশ কয়েকজন দুর্ধর্ষ অপরাধীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানেও গোয়েন্দা পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। নাশকতাকারীরা যেন কোনোভাবেই বিস্ফোরক বা দাহ্য পদার্থ সহজে সংগ্রহ করতে না পারে, সেজন্য রাজধানী এবং এর আশপাশের এলাকার পেট্রোল পাম্পগুলোর ওপর বিশেষ ও কড়া নজরদারি আরোপ করা হয়েছে।
পেট্রোল পাম্প বা অন্য কোনো খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে সন্দেহজনকভাবে খোলা পাত্রে বা বোতলে পেট্রোল, অকটেন বা অন্য কোনো দাহ্য পদার্থ কেনাবেচা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। পাম্প মালিকদেরও এই বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, যাতে তারা অননুমোদিত কোনো ব্যক্তির কাছে দাহ্য পদার্থ বিক্রি না করেন।
এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েও অপরাধীদের শনাক্ত করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, বাণিজ্যিক ভবন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর ফুটেজ সংগ্রহ করে সেগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
এই সিসিটিভি ফুটেজগুলো বিশ্লেষণ করে পুলিশ মূলত এটি শনাক্ত করার চেষ্টা করছে যে, কারা রাতের অন্ধকারে বা লোকচক্ষুর অন্তরালে নাশকতার উদ্দেশ্যে এসব দাহ্য পদার্থ বা বিস্ফোরক সংগ্রহ করছে এবং পরিবহন করছে।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ব্যবহার করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে ডিএমপির সাইবার ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত তৎপর রয়েছেন। ডিএমপির এই সাঁড়াশি অভিযান ও নিরবচ্ছিন্ন গোয়েন্দা কার্যক্রম অপরাধীদের শিকড় সমূলে উৎপাটন না করা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
পরিশেষে, পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ নাগরিকদের আতঙ্কিত না হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখার এবং যেকোনো সন্দেহভাজন কার্যকলাপ বা ব্যক্তির গতিবিধি লক্ষ্য করলে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ থানা বা পুলিশের জরুরি সেবায় তথ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য বিনীত আহ্বান জানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশের সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় সদা জাগ্রত এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।