এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতিনিধি তাদের দ্বারে ভোট চাইতে যাননি। এই উপেক্ষা সত্ত্বেও শাহিন আখতার এবং তার সম্প্রদায়ের মানুষেরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বদ্ধপরিকর, কারণ তারা মনে করেন এটি তাদের নাগরিক অস্তিত্বের অন্যতম প্রমাণ।
রংপুর বিভাগের আটটি জেলায় মোট ১ কোটি ৩৩ লাখ ৪২ হাজার ৭৬০ জন ভোটারের মধ্যে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার সংখ্যা মাত্র ১৩১ জন। যদিও বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি, কিন্তু উত্তরাধিকার সম্পত্তি ও সামাজিক বিড়ম্বনার ভয়ে অনেকেই নারী বা পুরুষ পরিচয়ে ভোটার হতে বাধ্য হয়েছেন।
আসন্ন নির্বাচনে এই অঞ্চলের ৩৩টি আসনে ২৩৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, অথচ হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা অভিযোগ করেছেন যে, মূলধারার রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ ও অধিকার নিয়ে দলগুলোর ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা নেই।
রংপুরের একমাত্র হিজড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী, যিনি রংপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি শেষ মুহূর্তে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসনের দাবিতে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। রানীর এই সরে দাঁড়ানো মূলত রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তাদের প্রতিনিধিত্বহীনতার প্রতি একটি নীরব প্রতিবাদ।
কমিউনিটির নেতারা বলছেন, তারা কেবল করুণা বা সহানুভূতি চান না, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে মানুষ হিসেবে মর্যাদা চান। কুড়িগ্রাম তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি পাখি আক্তার ও হিজড়া ভোটার কবির হোসেন মাহির মতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে তারা দীর্ঘকাল ধরে বৈষম্যের শিকার।
বিশেষ করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ ইউনিটের অভাব এবং পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকারের আইনি জটিলতা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি শহীদ হোসেন শ্রাবণ ও দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মারুফা আক্তার মিতু জোর দিয়ে বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী’ বলে দায় সারলে চলবে না; বরং সংসদে কোটা সংরক্ষণ, বিশেষ আইন প্রণয়ন এবং পুনর্বাসনের মতো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
নির্বাচনী মাঠে তাদের উপস্থিতি নগণ্য হলেও, তাদের দাবিগুলো অত্যন্ত জোরালো। নীলফামারীর নাহিদ ইসলামের মতো ভোটাররা চান নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে জবাবদিহিতা।
আগামী সরকারের কাছে এই জনগোষ্ঠীর মূল প্রত্যাশা হলো, আইনি ও সামাজিক বাধা দূর করে তাদের মূলধারার জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা এবং সংবিধানে বর্ণিত সম-অধিকারের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।