রবিবার, জুন ২৮, ২০২৬
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতালিতে মর্মান্তিক হামলায় একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি নিহত, গুরুতর আহত এক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬, ১২:১৩ এএম

ইতালিতে মর্মান্তিক হামলায় একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি নিহত, গুরুতর আহত এক
ছবি : Collected

ইতালির রাজধানী রোমে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক হামলায় একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। এই নিষ্ঠুর হামলায় পরিবারের আরও এক সদস্য গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন, যা স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায়সহ পুরো ইতালিতে গভীর শোক, আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

 

শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক নয়টার দিকে রোমের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত পিনেতা সাচেত্তি এলাকার ভিয়া মন্তিগ্লো সংলগ্ন একটি আবাসিক ভবনে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী এই ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত ও বিশ্লেষণ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

 

নিহতদের মধ্যে পরিবারের প্রধান হিসেবে কামাল হোসেনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জানা গেছে, তার পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায়।

 

উন্নত জীবন ও জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সপরিবারে ইতালিতে বসবাস করে আসছিলেন। এই ভয়াবহ হামলায় কামাল হোসেনের পাশাপাশি তার স্ত্রী এবং মাত্র পাঁচ বছর বয়সী এক ফুটফুটে কন্যাসন্তানও প্রাণ হারিয়েছে।

 

একই ঘটনায় দুষ্কৃতিকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন কামাল হোসেনের আঠারো বছর বয়সী বড় ছেলে। তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি করেছে পুলিশ।

 

স্থানীয় গণমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রাথমিক বিবরণ থেকে জানা যায়, শুক্রবার রাতে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে অস্ত্রধারী এক বা একাধিক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি ওই পরিবারের বাসভবনে অনুপ্রবেশ করে। তারা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরিবারের সদস্যদের ওপর অতর্কিত ও বর্বরোচিত হামলা চালায়।

 

হামলাকারীর ধারালো অস্ত্রের উপর্যুপরি আঘাতে ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন কামাল হোসেন, তার স্ত্রী এবং তাদের অবুঝ শিশুসন্তান। এই বর্বরোচিত ঘটনাটি এতটাই আকস্মিক ছিল যে, ভুক্তভোগীরা আত্মরক্ষার ন্যূনতম সুযোগটুকুও পাননি।

 

হামলার একপর্যায়ে কামাল হোসেনের আঠারো বছর বয়সী বড় ছেলে সাহসিকতার সঙ্গে হামলাকারীকে বাধা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আক্রমণকারীর নিষ্ঠুরতার হাত থেকে তিনিও রেহাই পাননি। তাকেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়।

 

গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় ওই তরুণ যখন সাহায্যের আশায় বাসভবন থেকে বাইরে বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করেন, ঠিক তখনই প্রতিবেশীরা বিষয়টি টের পান। পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পেরে আতঙ্কিত প্রতিবেশীরা কালক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে খবর দেন।

 

খবর পাওয়া মাত্রই ইতালির সাধারণ পুলিশ, জরুরি সেবাদানকারী দল এবং বিশেষায়িত পুলিশ বাহিনী কারাবিনিয়েরির একটি বিশাল দল ঘটনাস্থলে দ্রুত ছুটে আসে। তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাসভবনের ভেতর থেকে নিহত তিনজনের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেন।

 

পাশাপাশি, গুরুতর আহত বড় ছেলেকে উদ্ধার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় একটি উন্নত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা এই তরুণের বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, তিনি আপাতত আশঙ্কামুক্ত এবং তার শারীরিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

 

এই অভাবনীয় ও শোকাবহ ঘটনার পরপরই পুরো ভিয়া মন্তিগ্লো এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রোম পুলিশের পক্ষ থেকে গোটা এলাকায় এক বিশাল তল্লাশি অভিযান শুরু করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন এবং পলাতক ঘাতককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের বিভিন্ন বিভাগ একযোগে কাজ করছে।

 

ইতালীয় পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল এবং বৈজ্ঞানিক অপরাধ তদন্ত বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং সেখান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সম্ভাব্য আলামতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণাদি সংগ্রহ করেছেন। তবে, এখন পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি।

 

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই নৃশংস ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত কোনো হত্যাকাণ্ড, ডাকাতির উদ্দেশ্যে অনুপ্রবেশ, নাকি দীর্ঘদিনের কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে সংঘটিত হয়েছে-তার প্রতিটি দিকই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 

অপরাধীকে দ্রুত শনাক্ত করার লক্ষ্যে আশপাশের সমস্ত রাস্তা এবং ভবনের নিরাপত্তা ক্যামেরার দৃশ্যধারণ সংগ্রহ করে তা নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশের প্রযুক্তিগত তদন্ত বিভাগ। প্রতিটি সম্ভাব্য সূত্র ধরে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করছেন গোয়েন্দারা।

 

এদিকে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে এই ঘটনায় নেমে এসেছে শোকের কালো ছায়া। ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের নেতারা এবং সাধারণ প্রবাসীরা এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, প্রবাস জীবনে এমন নিরাপত্তাহীনতা তাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

 

সাধারণ কর্মজীবী মানুষের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা অবিলম্বে ঘাতকদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং প্রবাসীরা নিরাপদে বসবাস করতে পারেন।

 

রোম পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, এটি একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং লোমহর্ষক অপরাধ। অপরাধীকে গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

 

ইতালীয় পুলিশ আরও জানিয়েছে যে, তদন্তের বৃহত্তর স্বার্থে নিহতদের বিস্তারিত পরিচয় এবং মামলার অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে তদন্তের অগ্রগতি সাপেক্ষে পরবর্তীতে একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা হবে। এই দুঃসময়ে প্রবাসী সম্প্রদায়কে ধৈর্য ধারণের এবং তদন্ত কাজে পুলিশ প্রশাসনকে পূর্ণ সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।