মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিশেষ সম্পাদকীয় নিবন্ধে সংবাদমাধ্যমটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, দায়িত্ব গ্রহণের পর একজন সরকারপ্রধান তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে কোন দেশ বেছে নেবেন, সেটি সম্পূর্ণ তার স্বাধীন ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত।
এই সফর নিয়ে ভারতের অতিপ্রতিক্রিয়া তাদের 'দাদাগিরি' বা বড় ভাইসুলভ মানসিকতারই নগ্ন প্রকাশ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের এই কড়া প্রতিক্রিয়া দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রার মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদকীয়তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চলা এই রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য সপ্তদশ 'গ্রীষ্মকালীন দাভোস ফোরাম'-এ অংশ নিচ্ছেন।
চীনের মতে, বাংলাদেশের নতুন সরকার বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে কতটা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ এই সফর। সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং কৌশলগত সংলাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বেশ কয়েকটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বেশ কিছু বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ঘাটতি দূর করা এখন বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য।
এই লক্ষ্য অর্জনেই চীনের উন্নয়নমূলক সহযোগিতাকে কাজে লাগাতে চাইছে ঢাকা। অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত ১৬ বছর ধরে চীন ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা দেশের লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও, ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে চীন সরকার বাংলাদেশের জন্য শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা প্রদান করেছে।
এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্যসহ অন্যান্য রপ্তানি বাড়াতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে আঞ্চলিক কূটনীতির একটি বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছে চীন।
গ্লোবাল টাইমস স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগকে কাজে লাগাতে চীনের প্রতিবেশী অনেক দেশের শীর্ষ নেতারাই বেইজিং সফর করেছেন। চলতি মাসেই মিয়ানমারের রাষ্ট্রপ্রধান চীনে রাষ্ট্রীয় সফর সম্পন্ন করেছেন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে একমত হয়েছেন।
এর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, ব্রুনাইয়ের যুবরাজ এবং ভিয়েতনামের শীর্ষ নেতাও নিজ নিজ দেশের জ্বালানি, খনিজ সম্পদ ও ডিজিটাল অর্থনীতির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সহযোগিতা বাড়াতে চীন সফর করেছেন।
তাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে না দেখে, বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত। ভারতীয় গণমাধ্যমের সমালোচনার কড়া জবাব দিয়ে নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক উন্নয়ন কখনোই কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়।
কিছু ভারতীয় বিশ্লেষক ও সংবাদমাধ্যম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ভারতকে বেছে না নেওয়ায় যে চরম হতাশা ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, তাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছে গ্লোবাল টাইমস।
পত্রিকাটি জানিয়েছে, প্রতিবেশী কোনো দেশের নেতার প্রথম বিদেশ সফর মানেই তা আঞ্চলিক অভিভাবকের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যম হতে পারে না। এ ধরনের মন্তব্য অন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতি চরম অবমাননাকর।
বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতাকে ভারতের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে যে সতর্কতা দেওয়া হচ্ছে, তাকেও অযৌক্তিক বলে মনে করে চীন। পরিশেষে, গ্লোবাল টাইমস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে চীনের উন্মুক্ত আঞ্চলিক সহযোগিতা নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বেইজিং মনে করে, চীন ও ভারতের উচিত একে অপরের মিত্র ও অংশীদার হওয়া। ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে চীন সব সময় স্বাগত জানায়। এই সম্পর্কগুলো একে অপরের পরিপন্থী নয়, বরং পরিপূরক।
তিস্তা নদী প্রকল্পের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, ভারত ও বাংলাদেশ এই নদীর উজান ও ভাটির দেশ, অন্যদিকে চীন পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বন্যার পূর্বাভাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তাই এই ক্ষেত্রে তিন দেশের একত্রে কাজ করার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশ বড় হোক বা ছোট, সবাই সমান-শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এই নীতিতেই চীন বিশ্বাস করে এবং এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বেইজিং মনে করে।