বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৩, ২০২৬
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লিতে তীব্র হচ্ছে ছাত্র আন্দোলন, এবার নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ দাবি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম

দিল্লিতে তীব্র হচ্ছে ছাত্র আন্দোলন, এবার নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ দাবি
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পরীক্ষাসংক্রান্ত কেলেঙ্কারি ও শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে। জবাবদিহি ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নামা সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সমর্থন জানানোর পর পরিস্থিতি আরও গুরুতর আকার ধারণ করেছে।

 

বুধবার নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর এলাকায় অনলাইনভিত্তিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকে হাজার হাজার সমর্থকের এক বিশাল ও অভূতপূর্ব জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতে এই আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।

 

তবে সময়ের পরিক্রমায় এবং পুলিশের কঠোর দমন-পীড়নের জেরে এই বিক্ষোভ এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিতে রূপান্তরিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তার নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের জন্য এই আন্দোলন অন্যতম বৃহৎ ও কঠিন এক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিনিধিরা দিল্লির মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছেন যে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় আন্দোলনকারীরা রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত যন্তর মন্তর এলাকা ছাড়তে স্পষ্টতই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

 

সেখানে বুধবার সমবেত হওয়া হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষ অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী মোদির পদত্যাগের স্লোগান দেন। উপস্থিত বিশাল জনসমুদ্রের উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনার মাঝে সিজেপির অন্যতম মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, ধর্মেন্দ্র প্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই যন্তর মন্তর ত্যাগ করবেন না।

 

তিনি বলেন, যে দেশে সাধারণ মানুষ তাদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছিল এবং যে দেশে সরকারের যেকোনো যৌক্তিক সমালোচনাকে সরাসরি দেশদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য করা হতো, তারা আজ সেই ঘুমন্ত দেশটিকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছেন। তরুণ প্রজন্মের এই অভূতপূর্ব জাগরণ পুরো ভারতের রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

 

মূলত তরুণ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন মঙ্গলবার ভারতের প্রধান বিরোধী দলগুলোর আনুষ্ঠানিক সমর্থন লাভ করার পর মোদি সরকারের জন্য এক ভয়াবহ ও বহুমুখী সংকটের জন্ম দিয়েছে।

 

শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে মঙ্গলবার দেশের বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রী মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে এক নজিরবিহীন অবস্থান ধর্মঘট পালন করেন।

 

ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা রাহুল গান্ধী গত সোমবার লাখ লাখ অহিংস আন্দোলনকারীর ওপর পুলিশের চালানো নির্মম দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং এর জন্য সরকারকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছেন।

 

ছাপ্পান্ন বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিককে মঙ্গলবার প্রতিবাদস্থল থেকে পুলিশ জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় এবং প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রাখে। এর প্রতিবাদস্বরূপ বুধবার তিনি সম্পূর্ণ কালো পোশাক পরিধান করে পার্লামেন্ট অধিবেশনে উপস্থিত হন এবং সরকারের কাছে জবাবদিহির জোর দাবি জানান।

 

একই দিনে পার্লামেন্ট চত্বরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধী সমাজবাদী পার্টি। দলটির শীর্ষ নেতা অখিলেশ যাদব অভিযোগ করে বলেছেন, ভারতের প্রতিটি তরুণের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করছে এমন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ধারাবাহিকভাবে নীরব ও নির্বিকার ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

 

এই অভাবনীয় গণআন্দোলনের পেছনের ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। গত মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মামলার শুনানিকালে তরুণ সমাজকে অত্যন্ত অবমাননাকর ভাষায় ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা এবং ‘পরজীবী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

 

শীর্ষ বিচারপতির এমন মন্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই ভারতজুড়ে তরুণদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। বিচারপতির ওই মন্তব্যের তীব্র ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ হিসেবেই দেশটিতে অনলাইনভিত্তিক নতুন রাজনৈতিক আন্দোলন ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি আত্মপ্রকাশ করে।

 

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংগঠনের লাখ লাখ সক্রিয় অনুসারী রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্মটি কেবল শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতি নয়, বরং বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট এবং মোদি সরকারের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার মতো জাতীয় উদ্বেগজনক বিষয়গুলোকে তাদের আন্দোলনের মূল কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

 

গত সোমবার পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশনের শুরুর দিনে বিক্ষোভকারীরা যখন সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রা করার চেষ্টা করেন, তখন পুলিশ অত্যন্ত নির্দয়ভাবে তাদের লাঠিপেটা করে এবং মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

 

পুলিশের এই আগ্রাসী পদক্ষেপের পর বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তাদের ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে এবং আত্মরক্ষার্থে বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ গত পাঁচ বছরের মধ্যে দিল্লির রাজপথে অনুষ্ঠিত সবচেয়ে বড় গণজমায়েতে পরিণত হয়েছে।

 

দিল্লির এই বিক্ষোভে পুলিশের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের গুরুতর অভিযোগ তুলেছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে যে, দিল্লি পুলিশের এই আক্রমণাত্মক পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড অনুযায়ী আইনি বাধ্যবাধকতা, প্রয়োজনীয়তা এবং আনুপাতিকতার শর্ত আদৌ পূরণ করেছে কি না, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

এদিকে, আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে দায়ের করা একটি আবেদনের শুনানি করতে বুধবার সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। যন্তর মন্তরে টানা প্রায় এক মাস ধরে অবস্থান করা আন্দোলনকারীদের একজন জানিয়েছেন, এই প্রথম দেশের তরুণ সমাজ নিজেদের অধিকার নিয়ে উচ্চকণ্ঠে কথা বলার একটি বাস্তব সুযোগ পেয়েছে।

 

সংবাদ সংস্থা এএফপিকে কাব্য নামের বিশ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী নিজের ভয়ের কথা জানিয়ে বলেন, তিনি অত্যন্ত ভীত কারণ গত সোমবার তিনি নিজ চোখে পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের ওপর অমানবিক কায়দায় মারধর ও বলপ্রয়োগ করতে দেখেছেন।

 

তবে তিনি এ কথাও দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। সর্বভারতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ পরীক্ষাসংক্রান্ত ধারাবাহিক কয়েকটি ভয়াবহ অনিয়মের পর মূলত এই গণআন্দোলনের সূত্রপাত হয়।

 

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ওই নজিরবিহীন কেলেঙ্কারির কারণে দেশের প্রায় বিশ লাখেরও বেশি নিরীহ পরীক্ষার্থী পুনরায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়েছেন, যা তাদের জন্য চরম মানসিক ও আর্থিক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এর পাশাপাশি প্রায় বিশ লাখ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ করা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার অনলাইন মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কও জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ উসকে দিয়েছে। আন্দোলনকারী ও বিরোধী দলগুলোর ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে থাকা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান অবশেষে মুখ খুলেছেন।

 

তিনি জানিয়েছেন যে, সরকার শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করতে এবং পার্লামেন্টে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সোমবারের ব্যাপক প্রতিবাদের পর মঙ্গলবার শেষ রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া নিজের প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্যে তিনি লেখেন যে, শিক্ষার্থীদের কাছে সরকারের জবাব, সংস্কার এবং জবাবদিহি করার সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা বিশৃঙ্খলার চেয়ে নিশ্চয়তা, স্লোগানের চেয়ে সমাধান এবং বিঘ্ন ঘটানোর চেয়ে দায়িত্বশীলতা বেশি পাওয়ার যোগ্য। তবে শিক্ষামন্ত্রীর এই আশ্বাসে চিঁড়ে ভেজেনি, বরং সিজেপির প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন দিল্লির সীমানা ছাড়িয়ে এখন দেশের অন্যান্য বড় শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

 

ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত মহারাষ্ট্রের মুম্বাইসহ বেঙ্গালুরু ও গোয়াতেও এখন হাজার হাজার মানুষ এই দাবির পক্ষে রাজপথে নেমে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন।

 

- এএফপি