একদিকে যেমন লাখো শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারণী পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছে, অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত উপায়ে পরীক্ষা দেওয়ার চেষ্টার কারণে কয়েকজনকে বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোর কঠোর নজরদারি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও, দেশব্যাপী নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে মোট ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থী প্রথম দিনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত ছিল।
এছাড়া, পরীক্ষার হলে নিয়ম ভঙ্গ ও অসদুপায় অবলম্বনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দেশের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে মোট সাতজন পরীক্ষার্থীকে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, পরীক্ষার প্রথম দিনে কোনো কেন্দ্রেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো শিক্ষক, পরীক্ষক বা পরিদর্শক বহিষ্কারের শিকার হননি, যা কেন্দ্রগুলোর সার্বিক প্রশাসনিক শৃঙ্খলার একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বাংলা (আবশ্যিক) প্রথম পত্র, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কুরআন মাজীদ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন বিদেশের মাটিতে থাকা আটটি পরীক্ষা কেন্দ্র ব্যতীত দেশের অভ্যন্তরীণ সব কটি কেন্দ্রে সম্পূর্ণ অভিন্ন সময়ে ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে এই পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সম্মানিত সভাপতি এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আমিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষার প্রথম দিনের সার্বিক পরিসংখ্যান, উপস্থিতি এবং বহিষ্কারের তথ্য গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করা হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বস্তুনিষ্ঠতা ও স্বচ্ছতার নীতি অনুসরণ করে এই পরিসংখ্যানটি অত্যন্ত সুচারুভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে দেশের নাগরিকরা পরীক্ষার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারেন।
প্রকাশিত সরকারি বিজ্ঞপ্তির তথ্য ও পরিসংখ্যান নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রথম দিনের বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় মোট নিবন্ধিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭ জন।
এর মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ১ হাজার ৬২০টি কেন্দ্রে সশরীরে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৪ জন শিক্ষার্থী। সে হিসেবে সাধারণ বোর্ডগুলোতে প্রথম দিনে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ২৩৩ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর শতকরা ২ দশমিক ০১ ভাগ।
এই বোর্ডগুলোর অধীনে অসদুপায় অবলম্বনের কারণে মোট পাঁচজন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বোর্ডভিত্তিক বিশ্লেষণে জানা যায়, কুমিল্লা বোর্ডে একজন, যশোর বোর্ডে দুজন, দিনাজপুর বোর্ডে একজন এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে একজন পরীক্ষার্থী শাস্তিমূলক এই ব্যবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন।
তবে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল বোর্ডে শৃঙ্খলা ভঙ্গের বা বহিষ্কারের মতো কোনো নেতিবাচক ঘটনা ঘটেনি, যা এই অঞ্চলগুলোর পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোর কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি ও শৃঙ্খলার চমৎকার প্রমাণ দেয়।
সাধারণ বোর্ডগুলোর উপস্থিত ও অনুপস্থিতির পরিসংখ্যান আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে অঞ্চলভিত্তিক অনুপস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল ঢাকা বোর্ডে। এই বোর্ডে অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৯৭১ জন, যার শতকরা হার ১ দশমিক ৫৮ ভাগ।
এছাড়া, অন্যান্য বোর্ডের মধ্যে রাজশাহী বোর্ডে ২ হাজার ৪৯৭ জন (২ দশমিক ২১ শতাংশ), কুমিল্লা বোর্ডে ১ হাজার ৭৯৫ জন (১ দশমিক ৯১ শতাংশ), যশোর বোর্ডে ২ হাজার ৭৮ জন (২ দশমিক ৩৯ শতাংশ), চট্টগ্রাম বোর্ডে ১ হাজার ৩৪০ জন (১ দশমিক ৪৩ শতাংশ), সিলেট বোর্ডে ১ হাজার ১২৭ জন (১ দশমিক ৯৪ শতাংশ), বরিশাল বোর্ডে ১ হাজার ৩৪৬ জন (২ দশমিক ৫৬ শতাংশ), দিনাজপুর বোর্ডে ১ হাজার ৯৩৭ জন (২ দশমিক ১৩ শতাংশ) এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ১ হাজার ১৮২ জন (২ দশমিক ০৫ শতাংশ) পরীক্ষার্থী তাদের প্রথম দিনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি।
অন্যদিকে, ধর্মীয় শিক্ষার অন্যতম পাদপীঠ বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত কুরআন মাজীদ পরীক্ষার চিত্রটিও বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই বোর্ডের অধীনে মোট ৮৫ হাজার ১৩১ জন নিবন্ধিত পরীক্ষার্থীর মধ্যে সারা দেশের ৪৬০টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে ৮০ হাজার ৬৫৩ জন শিক্ষার্থী।
এই বোর্ডে অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৪৭৮ জন। সাধারণ বোর্ডগুলোর তুলনায় মাদ্রাসা বোর্ডে অনুপস্থিতির হার তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি, যা শতকরা ৫ দশমিক ২৬ ভাগ। পরীক্ষার হলে শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে এবং অনৈতিক উপায়ে পরীক্ষা দেওয়ার দায়ে এই বোর্ডের অধীনে একজনকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
একইভাবে, কারিগরি শিক্ষার প্রসারে কাজ করা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষায়ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এই বোর্ডের অধীনে মোট ৮৩ হাজার ৬৭৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬১১টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় বসেছে ৮০ হাজার ৬০৩ জন শিক্ষার্থী।
প্রথম দিনে এই বোর্ডে অনুপস্থিত ছিল ৩ হাজার ৭৩ জন পরীক্ষার্থী, যার শতকরা হার ৩ দশমিক ৬৭ ভাগ। কারিগরি বোর্ডেও পরীক্ষা চলাকালীন অসদুপায় অবলম্বনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে একজন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কৃত করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দেশব্যাপী এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনে মোট ১০ লাখ ২৪ হাজার ৯০৪ জন নিবন্ধিত পরীক্ষার্থীর মধ্যে চূড়ান্তভাবে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১০ লাখ ১২০ জন। সার্বিক দিক বিবেচনা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বোর্ড কর্তৃপক্ষ প্রথম দিনের পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং আগামী পরীক্ষাগুলোতেও এই ধরনের স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।