মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভুল ও উগ্র কৌশলে কি মেসির সঙ্গে প্রতারণা করল আর্জেন্টিনা?

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০৫:০২ পিএম

ভুল ও উগ্র কৌশলে কি মেসির সঙ্গে প্রতারণা করল আর্জেন্টিনা?
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের চূড়ান্ত লড়াই শেষে স্প্যানিশ তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের ঠিক বিপরীত এক বিষাদময় চিত্র ফুটে উঠেছিল লিওনেল মেসির চোখেমুখে। নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থক যখন প্রিয় নায়কের নাম ধরে অবিরাম গান গাইছিলেন, তখন সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত মেসি এক গভীর ও শূন্য দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

 

৩৯ বছর বয়সি এই ফুটবল জাদুকরের শারীরিক ভাষা দেখে মনে হচ্ছিল, বিশ্বমঞ্চে এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা পাওয়ার হয়তো এটাই তার শেষ মুহূর্ত। শুধু মেসিই নন, দলের এমন হৃদয়বিদারক বিদায়ের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে থাকা কোচ লিওনেল স্কালোনিও।

 

কিংবদন্তি এই ফরোয়ার্ডের এটাই শেষ ম্যাচ কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি রীতিমতো আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। আগামী ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলা স্কালোনি জানান, মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে তার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। এরপর তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং সংবাদ সম্মেলন অসম্পূর্ণ রেখেই বিদায় নেন।

 

ফুটবল বিশ্বে সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে ভাটা পড়ে। কিন্তু সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় মেসি ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনায় অভিষেকের পর থেকে অন্তত পাঁচবার নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। বয়স বা গতির অভাবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি বারবার খেলাটিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।

 

বর্তমান আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মায়ামির মেসি সেই দীর্ঘ রূপান্তরেরই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এবারের বিশ্বকাপেও তিনি তার পায়ের জাদুতে বিশ্বজোড়া ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছেন। কিন্তু গত রাতের ফাইনালে স্পেনের কাছে শিরোপা হারানোর পর মেসির অবিস্মরণীয় বিশ্বকাপ যুগের যে বিষাদময় সমাপ্তি ঘটল, তাতে মনে হচ্ছিল যেন তার নিজের দলই ভুল কৌশলের মাধ্যমে তার সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা করেছে।

 

ম্যাচের শুরু থেকে আর্জেন্টিনা যে মাত্রারিক্ত আক্রমণাত্মক ও মারমুখী কৌশল গ্রহণ করেছিল, তা দলের প্রধান অনুপ্রেরণা ও প্রাণভোমরা মেসিকে কোনোভাবেই সহায়তা করেনি। বরং এই ভুল কৌশল তাকে গোটা ম্যাচজুড়ে কার্যত একজন নিষ্ক্রিয় দর্শকে পরিণত করেছিল।

 

স্পেনের এই জয়টি ছিল মূলত সুন্দর ফুটবলেরই জয়, কারণ ফাইনালে আর্জেন্টিনার পুরো মনোযোগ ফুটবল খেলার চেয়ে অন্য সবকিছুর দিকেই বেশি ছিল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ম্যাচের শুরুর দিকে স্লোভেনিয়ার রেফারি স্লাভকো ভিনচিক বেশ শিথিলতা প্রদর্শন করেন, যা টুর্নামেন্টজুড়ে প্রতিপক্ষ দলগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছিল।

 

স্পেনের দানি ওলমোর ওপর আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি মারাত্মক ফাউলের পরও রেফারি তাকে কেবল সতর্ক করে ছেড়ে দেন। এর প্রতিবাদে স্প্যানিশ সমর্থকরা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নাম ধরে গ্যালারি থেকে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান দিতে শুরু করেন।

 

এটি ছিল মূলত সেইসব বিতর্কের ইঙ্গিত, যেখানে দাবি করা হচ্ছিল যে টুর্নামেন্টের কর্মকর্তাদের পক্ষপাতিত্বের কারণেই আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার পথ সুগম হয়েছে। মাঠে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলাহীন আচরণ ছিল দৃষ্টিকটু।

 

মিকেল ওয়ারজাবালকে ফাউল করার দায়ে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ম্যাচের ৪০ মিনিটে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন, যা স্টেডিয়ামে উপস্থিত অনেকের কাছেই ছিল চরম বিস্ময়ের। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা যে অনবদ্য ফুটবল প্রতিভা দেখিয়েছিল, ফাইনালে এসে তা এমন নেতিবাচক কৌশলে নষ্ট হতে দেখাটা ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক।

 

একপর্যায়ে মেসি নিজেও এই উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়েন। স্পেনের মার্ক কুকুরেয়াকে বহিষ্কারের দাবিতে তিনি রেফারির কাছে আবেদন জানান, কারণ কুকুরেয়া মুখের ওপর হাত রেখে কথা বলছিলেন।

 

কিন্তু আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্সের সবচেয়ে কলঙ্কজনক মুহূর্তটি আসে যখন খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর ঠিক আগমুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজ বিনা কারণে স্প্যানিশ ডিফেন্ডার পাউ কুবারসির ওপর চড়াও হন।

 

চেলসির এই মিডফিল্ডার যখন প্রতিপক্ষকে মাটিতে আছড়ে ফেলেন, তখন তার নজর বলের দিকে ছিল না। ফলে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড তথা লাল কার্ড দেখে তার মাঠ ছাড়াটা ছিল সম্পূর্ণ যৌক্তিক।

 

পরিসংখ্যানের দিক থেকেও ফাইনালটি আর্জেন্টিনার জন্য ছিল চরম লজ্জার। বিশ্বকাপের ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে আর্জেন্টিনা নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলমুখে একটিও শট নিতে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ১১৭তম মিনিটে তীব্র হতাশার মধ্যে মেসি যখন একটি শট নেওয়ার সুযোগ পান, সেটিও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

 

বিপরীতে স্পেনের অন টার্গেট শট ছিল ১২টি। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের সীমানায় যতগুলো সফল পাস দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি ফাউল করেছে; তাদের পাসের সংখ্যা ছিল আটটি এবং ফাউল ছিল নয়টি। এই পরিসংখ্যানই ফাইনাল ম্যাচে তাদের নেতিবাচক খেলার ধরনকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে।

 

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা মেসির সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়লেও, মুহূর্তের মধ্যেই তা দুই দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের মধ্যে এক বিশ্রী হাতাহাতিতে রূপ নেয়। বদলি হিসেবে নামা লিয়ান্দ্রো পারেদেস আক্রমণাত্মক হয়ে এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরেন এবং গাভিকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার মতো অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দেন।

 

বিশ্বকাপের মতো এমন একটি অসাধারণ বৈশ্বিক টুর্নামেন্টকে এমন বিশৃঙ্খল ও অপ্রীতিকর সমাপ্তির জন্য কখনোই মনে রাখা উচিত নয়। বিশ্বমঞ্চে নিজের ৩৪তম ম্যাচ খেলা লিওনেল মেসি হয়তো আর কখনোই বিশ্বকাপের আঙিনায় ফিরবেন না।

 

তবে ফাইনালে দলের এমন হতাশাজনক ও অখেলোয়াড়সুলভ পারফরম্যান্সের পরও এই কথা নির্দ্বিধায় মানতে হবে যে, এই আর্জেন্টাইন জাদুকর ফুটবল ইতিহাসের সবুজ গালিচায় পা রাখা সর্বকালের অন্যতম সেরা এক অবিসংবাদিত কিংবদন্তি।