মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আর্জেন্টিনা পরাজয়ের পর বুয়েনস আইরেসে সহিংসতা, নিহত ১

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম

আর্জেন্টিনা পরাজয়ের পর বুয়েনস আইরেসে সহিংসতা, নিহত ১
ছবি: সংগৃহীত

ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি আর্জেন্টিনার জন্য দিনটি ছিল চরম হতাশা, আক্ষেপ ও বেদনার। স্পেনের বিপক্ষে বহুল প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্ত লড়াইয়ে অতিরিক্ত সময়ের একমাত্র গোলে পরাজিত হওয়ার পর সমগ্র আর্জেন্টিনা যেন এক গভীর শোকের চাদরে ঢাকা পড়ে।

 

বিশ্বকাপ জয়ের অধরা স্বপ্ন আরও একবার চোখের সামনে ভেঙে যাওয়ার পর দেশটির রাজধানী বুয়েনস আইরেসের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক ওবেলিস্ক চত্বরে লাখো মানুষের আবেগ ও কান্না একপর্যায়ে চরম অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহ এক সহিংসতায় রূপ নেয়।

 

আনন্দ, উদ্‌যাপন ও উৎসবের চিরচেনা এই কেন্দ্রবিন্দু মুহূর্তের মধ্যেই পরিণত হয় রণক্ষেত্রে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একদল উচ্ছৃঙ্খল সমর্থকের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান বয়োজ্যেষ্ঠ এক নিরপরাধ ফুটবলপ্রেমী।

 

খেলার চূড়ান্ত বাঁশি বাজার পরপরই হতাশ ও ভগ্নহৃদয় হাজারো সমর্থক একে অপরকে সান্ত্বনা দিতে এবং দলের প্রতি নিজেদের অবিচল ভালোবাসা ও সমর্থন প্রদর্শন করতে ঐতিহ্যবাহী ওবেলিস্ক চত্বরে জড়ো হতে শুরু করেন।

 

প্রথমদিকে এই বিশাল জমায়েতটি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। নীল-সাদা জার্সি গায়ে জড়ানো আপামর জনসাধারণ তাদের প্রিয় দলের পরাজয়ের কষ্ট ভাগাভাগি করে নিচ্ছিলেন। কিন্তু রাতের আঁধার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শোকাবহ পরিবেশ হঠাৎ করেই একটি ভীতিকর ও আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করে।

 

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পেশাদার সংবাদমাধ্যমের সরেজমিন প্রতিবেদন অনুযায়ী, জমায়েতের মধ্যে থাকা একটি নির্দিষ্ট উচ্ছৃঙ্খল, বেপরোয়া ও উগ্র গোষ্ঠী আকস্মিকভাবে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালায়।

 

তারা আইনশৃঙ্খলার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে পুলিশ কর্তৃক নির্ধারিত কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে জবরদস্তি করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে তাদের সরাসরি ও তুমুল সংঘাত বেধে যায়।

 

পরিস্থিতি অত্যন্ত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকলে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হয়। উন্মত্ত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে এবং সম্পত্তি রক্ষার্থে পুলিশ প্রাথমিকভাবে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।

 

কিন্তু উত্তেজিত সমর্থকরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও বোতল ছুড়তে শুরু করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বাধ্য হয়ে পুলিশ তখন রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে জনতাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা চালায়।

 

এই সংঘর্ষের কারণে পুরো ওবেলিস্ক চত্বর এবং এর সংলগ্ন ঐতিহাসিক ‘নাইন দে হুলিও’ সড়ক এলাকা এক শ্বাসরুদ্ধকর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়া ও আতঙ্কে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনায় বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যসহ অগণিত সাধারণ মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন বলে বুয়েনস আইরেসের স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সদর দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে।

 

আহতদের অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং রাতের বেলায় আরও বড় কোনো ধরনের নাশকতা এড়াতে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত পনেরো জন উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশ প্রশাসন।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অত্যন্ত সুসংগঠিত, দ্রুত ও জোরালো অভিযানের পর অল্প সময়ের মধ্যেই ওই এলাকাটি সম্পূর্ণ জনশূন্য করে দেওয়া সম্ভব হয়। অন্যদিকে, এই তীব্র উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলার রাতে বুয়েনস আইরেস শহরে আরও একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।

 

ফুটবলীয় উত্তেজনার চরম মুহূর্তে নিজ দলের খেলা চলাকালীন এক ৬৭ বছর বয়সি বয়োজ্যেষ্ঠ সমর্থক আকস্মিকভাবে মারাত্মক হৃদরোগে আক্রান্ত হন। স্থানীয় জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী সংস্থা বা এসএএমই-এর পক্ষ থেকে এই মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বৃদ্ধ সমর্থক খেলা দেখার সময় দলের পরাজয়ের শঙ্কায় চরম মানসিক চাপ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন এবং খেলা চলাকালেই হঠাৎ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। উপস্থিত জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেখানে পৌঁছে তাকে বাঁচানোর জন্য তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের আধুনিক প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন।

 

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদের সকল চিকিৎসাপ্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ওই সমর্থক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, যা উপস্থিত সকলের মাঝে শোকের ছায়া নামিয়ে আনে। সহিংসতা ও পুলিশি অভিযানের পর বুয়েনস আইরেসের কেন্দ্রস্থলের চিত্র ছিল অত্যন্ত বিভীষিকাময় ও বিষাদগ্রস্ত।

 

ঐতিহ্যবাহী ওবেলিস্ক চত্বর এবং বিস্তৃত নয়ই জুলাই সড়ক জুড়ে কেবলই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ভাঙা কাঁচের টুকরো, প্লাস্টিকের বোতল, ইট-পাথর এবং বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। যে প্রশস্ত সড়কটি মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও লাখো মানুষের পদচারণায়, স্লোগানে ও গানে মুখরিত ছিল, তা নিমেষেই পরিণত হয় এক নীরব ধ্বংসস্তূপে।

 

পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পরবর্তীতে এসে এই বিশাল এলাকার আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন, তবে সেখানের বাতাসে তখনও যেন বিষাদের সুর ভাসছিল। ফুটবল আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে কেবল একটি সাধারণ খেলা নয়, বরং এটি তাদের গভীর আবেগ, জীবনযাপন, সংস্কৃতি এবং জাতীয় পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

বিশ্বকাপের মতো আসরে স্পেনের কাছে এই অপ্রত্যাশিত পরাজয় তাদের সেই আত্মিক ভালোবাসায় এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, যা এই বিপুল হতাশার জন্ম দেয়। অধিকাংশ সাধারণ ও প্রকৃত ফুটবল সমর্থক অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে নিজেদের দলের প্রতি অটুট সমর্থন ব্যক্ত করে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে গিয়েছিলেন।

 

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হঠকারী, উগ্র ও চরম সহিংস আচরণের কারণে দিনটির বিদায়ী প্রহরটি এমন কলঙ্কিত ও রক্তাক্ত রূপ নিল, যা বিশ্বমঞ্চে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক উদাহরণ হয়ে থাকবে।