২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কিংবা শিরোপা জয়ের এক সাধারণ লড়াই ছিল না; বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর জন্য এটি ছিল হৃদয় ভেঙে দেওয়া এক বিষাদময় বিদায়গাথা।
একটি সোনালী প্রজন্মের বিদায়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক দীর্ঘ, বর্ণিল ও অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। বিশ্বকবির সেই অবিনশ্বর চরণের মতোই-‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’, ঠিক তেমনিভাবে ফুটবল ইতিহাসের একদল মহানায়কের পায়ের চিহ্ন আর কখনও বিশ্বকাপের সবুজ গালিচায় পড়বে না।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং পর্তুগিজ কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ইতিমধ্যেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, ৪১ বছর বয়সে খেলা এই আসরটিই তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ।
টানা ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের মতো এক বিরল ও অনন্য রেকর্ড গড়া এই মহাতারকার খেলায় বয়সের কারণে স্বাভাবিকভাবেই গতি ও ফিটনেসে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ দুই দশক ধরে শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার পর, শারীরবৃত্তীয় বাস্তবতায় তিনি চাইলেও হয়তো তার পক্ষে আর বিশ্বমঞ্চে ফেরা সম্ভব নয়।
এক অদম্য মানসিকতা নিয়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা অনাগত প্রজন্মের জন্য আজীবন এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। অন্যদিকে, ২০১৪ সালের ফাইনালে হারের তীব্র বেদনা ভুলে ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ জেতানো মহাতারকা লিওনেল মেসির জন্যও এটি সম্ভবত বিশ্বমঞ্চে শেষ উপস্থিতি।
৩৯ বছর বয়সি এই আর্জেন্টাইন জাদুকর তার বর্ণিল ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলে ফেললেন এবারের আসরে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে হারের পর তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের কাছে কিছু না জানালেও, ফুটবল বিশ্লেষকদের প্রবল ধারণা, বিশ্বমঞ্চে স্পেনের বিপক্ষেই তিনি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি খেলে ফেলেছেন।
শিরোপার এতো কাছাকাছি গিয়ে খালি হাতে ফেরার আক্ষেপ থাকলেও, গত দুই দশক ধরে তিনি ফুটবলকে যা দিয়েছেন, তা তাকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে রেখেছে। ক্রোয়েশিয়ার অবিসংবাদিত নেতা এবং কিংবদন্তি মিডফিল্ডার লুকা মদ্রিচ ৪০ বছর বয়সে এসেও নিজের দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।
তবে বয়সের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় সদ্য সমাপ্ত আসরটিই তার জীবনের শেষ বিশ্বকাপ হয়ে থাকছে। এদিকে, ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড নেইমার জুনিয়রের বয়স মাত্র ৩৪ হলেও, ক্যারিয়ারজুড়ে মারাত্মক সব ইনজুরি তাকে বারবার মাঠের বাইরে ছিটকে ফেলেছে। এবারের বিশ্বকাপের মূল দলেও তার অংশগ্রহণ ঘিরেই ছিল চরম অনিশ্চয়তা।
তবে ব্রাজিলের বর্তমান কোচ কার্লো আনচেলত্তি শেষ পর্যন্ত তার অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা রেখেছিলেন। সরাসরি অবসরের ঘোষণা না দিলেও, নরওয়ের বিপক্ষে হেরে দলের অনাকাঙ্ক্ষিত বিদায়ের পর নেইমার অত্যন্ত বিষণ্ণ কণ্ঠে জানিয়েছেন যে, ‘এখানেই শুরু, এখানেই শেষ।’
তার এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যই আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চ থেকে তার বিদায়ের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। কেবল এই চার মহারথীই নন, আগামী বিশ্বকাপগুলোতে আরও অনেক বিশ্বখ্যাত ও পরিচিত মুখকে আর দেখা যাবে না।
আধুনিক ফুটবলে ‘সুইপার-কিপার’ ভূমিকার প্রকৃত রূপকার এবং ২০১৪ সালে জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ম্যানুয়েল ন্যুয়ারও আন্তর্জাতিক মঞ্চকে চিরতরে বিদায় জানাচ্ছেন।
এছাড়া বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মের প্রধান প্রতিনিধি ও বিশ্বমানের প্লে-মেকার কেভিন ডি ব্রুইনা, মিশরের আক্রমণভাগের প্রাণভোমরা মোহামেদ সালাহ, নেদারল্যান্ডসের রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী ভার্জিল ভ্যান ডাইক, দক্ষিণ কোরিয়ার তারকা ফরোয়ার্ড সন হিউয়েন মিন এবং মেক্সিকোর গোলপোস্টের দীর্ঘদিনের আস্থার প্রতীক গিলের্মো ওচোয়াদের মতো মহাতারকারাও বিশ্বকাপকে বিদায় জানিয়েছেন।
এই দীর্ঘ ও বেদনাবিধুর তালিকায় আরও যুক্ত হয়েছেন আর্জেন্টিনার নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার নিকোলাস ওটামেন্ডি, ব্রাজিলের অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার কাসেমিরো, বসনিয়ার আক্রমণভাগের ভরসা এডিন জেকো এবং স্কটল্যান্ডের গোলরক্ষক ক্রেইগ গর্ডনের মতো কিংবদন্তি ফুটবলাররা।
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরগুলো যুগে যুগে নতুন প্রতিভার জন্ম দেয়, আবার পুরোনো কিংবদন্তিদের বিদায়ও জানায়। এটিই ক্রীড়াজগতের এক অমোঘ নিয়ম। তবে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, লুকা মদ্রিচ ও নেইমারদের মতো খেলোয়াড়রা গত দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলকে যে অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তা ক্রীড়া ইতিহাসে নিঃসন্দেহে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তাদের বিদায়ের মাধ্যমে সবুজ গালিচায় যে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা হয়তো সহসাই পূরণ হওয়ার নয়। বিশ্ব ফুটবল হয়তো অদূর ভবিষ্যতে নতুন তারকা পাবে, নতুন কিংবদন্তির জন্ম হবে, কিন্তু এই সোনালী প্রজন্মের মহাতারকাদের পায়ের জাদুর অভাব কোটি ভক্তের হৃদয়ে এক চিরস্থায়ী আক্ষেপ হয়েই থেকে যাবে।