লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যদের এই সূক্ষ্ম কৌশলগত পরিকল্পনার কারণে পুরো ম্যাচে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে লিওনেল স্কালোনির শক্তিশালী আক্রমণভাগের ওপর।
আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে বোতলবন্দি করে রাখার এই নিখুঁত ছক বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ম্যাচের সামগ্রিক পরিসংখ্যান এবং মাঠের চিত্র নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পেনের এই একচেটিয়া আধিপত্যের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
প্রথমার্ধে লিওনেল মেসির পায়ে বল এসেছে মাত্র ১৫ বার। গত তিনটি বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথমার্ধে এটিই তার বলের সবচেয়ে কম স্পর্শ। অবাক করার মতো বিষয় হলো, ম্যাচ শুরুর কিক-অফ থেকে সতীর্থকে দেওয়া সাধারণ পাসটিই ছিল প্রথম ১৫ মিনিটে তার একমাত্র কার্যকর অবদান।
ফাইনালে স্পেনের মূল কৌশল ছিল বলের দখলে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখা। যখনই তারা বল হারিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে তীব্র প্রেসিংয়ের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পুনরায় তা পুনরুদ্ধার করে নিয়েছে। পুরো ম্যাচজুড়েই এই একই চিত্রের নিরবচ্ছিন্ন পুনরাবৃত্তি করে আর্জেন্টিনাকে নিজেদের অর্ধে কোণঠাসা করে রাখে স্প্যানিশ বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
ফলশ্রুতিতে, আলবিসেলেস্তেদের আক্রমণভাগের সবচেয়ে বড় ভরসা এবং প্রাণভোমরা মেসির কাছে বল পৌঁছানোর সকল সম্ভাব্য পথই প্রায় সম্পূর্ণভাবে রুদ্ধ হয়ে যায়। স্পেনের এই তীব্র প্রেসিং এবং প্রতিপক্ষকে দমবন্ধ করে রাখা ট্যাকটিক্স সম্পর্কে ফক্স স্পোর্টসের একটি বিশ্লেষণী অনুষ্ঠানে কথা বলেছেন ফরাসি ফুটবল কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি।
স্প্যানিশদের এমন প্রবল মানসিক ও শারীরিক চাপের বিরুদ্ধে খেলার বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত চমৎকার একটি উপমা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, 'মনে হয় যেন মাথা পানির নিচে ডুবে আছে। এটি যেন দম বন্ধ হয়ে আসার মতো পরিস্থিতি।'
অঁরির এই সুনির্দিষ্ট বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট অনুমেয় যে, মাঠে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের, বিশেষ করে মেসিকে ঠিক কতটা অসহায় ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ৩৯ বছর বয়সী মেসির বিস্ফোরণগতির সেই আগের ধার যে আর অবশিষ্ট নেই, এই ধ্রুব সত্যটি স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা খুব ভালোভাবেই বিবেচনায় রেখেছিল।
বয়সের কারণে আসা এই শারীরিক সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে স্পেন তাদের ডিফেন্সিভ লাইন বা রক্ষণভাগকে অনেকটা ওপরে তুলে আনে। এর ফলে মাঠে খেলার কার্যকর জায়গা উল্লেখযোগ্য হারে সংকুচিত হয়ে যায় এবং মেসি তার স্বাভাবিক জাদুকরি খেলা প্রদর্শনের জায়গা হারিয়ে ফেলেন।
ম্যাচের একেবারে শুরুর দিকে একবার মেসি স্প্যানিশ রক্ষণভাগ ভেদ করে বিপজ্জনকভাবে এগিয়ে যাওয়ার একটি দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু স্পেনের অতন্দ্র প্রহরী গোলরক্ষক উনাই সিমন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নিজের গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে আসেন এবং প্রায় মাঝমাঠের কাছাকাছি এসে বলটি ক্লিয়ার করে দলকে বিপদমুক্ত করেন।
এত বিপুল চাপ এবং কড়া পাহারার মুখেও মেসি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে বিপজ্জনক ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু স্প্যানিশ খেলোয়াড়রা প্রতিবারই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এবং দলীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে সেই পথ রুদ্ধ করে দেয়।
প্রথমার্ধের কুলিং ব্রেকের ঠিক আগমুহূর্তে একবার মাঝমাঠে ঘুরে বল নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন মেসি। কিন্তু তার সেই প্রচেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয়নি প্রতিপক্ষ; সঙ্গে সঙ্গেই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেন।
টুর্নামেন্টের আগের ম্যাচগুলোতে, বিশেষ করে ইংল্যান্ড ও মিশরের বিপক্ষে, মেসি ডান প্রান্তে সরে গিয়ে জাদুকরিভাবে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। ফাইনালেও তিনি ঠিক একই কৌশল অবলম্বন করে স্পেনের সুদৃঢ় মিডফিল্ড ও দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগকে ফাঁকি দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন।
কিন্তু স্প্যানিশ দলটি যেন আগে থেকেই এই পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। মেসি বল পাওয়া মাত্রই দ্রুতগতিতে দুই বা ততোধিক স্প্যানিশ খেলোয়াড় তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলেন এবং তার সামনে অগ্রসর হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগও ধ্বংস করে দেন।
তবে ফাইনালে বিশ্বমঞ্চে মেসির এই প্রভাব কমে যাওয়ার মূল কারণ কেবল তার ব্যক্তিগত নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স বা বয়সজনিত ধীরগতি ছিল না। এর নেপথ্যে প্রধান কারণ ছিল মাঠে স্পেনের পূর্ণাঙ্গ আধিপত্য বিস্তার।
স্প্যানিশরা বারবার আর্জেন্টিনার কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে বলের দখল নিজেদের কাছে রেখেছিল, যার কারণে মেসিকে প্রায় পুরো ম্যাচজুড়েই বল পাওয়ার জন্য অসহায়ভাবে অপেক্ষা করতে বাধ্য হতে হয়। সতীর্থদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত বলের জোগান না পাওয়ায় তিনি মাঠে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
পুরো ম্যাচে তিনি সামান্য যে কয়েকটি সুযোগ পেয়েছিলেন, সেগুলোর ওপরই তাকে পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়েছে। শেষমেশ টুর্নামেন্টের অন্যান্য শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচের মতো এই কঠিন সময়ে আর জাদুকরি কিছু করে নিজ দল আর্জেন্টিনাকে উদ্ধার করতে পারেননি এই কিংবদন্তি।
অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচের ১০৬ মিনিটে ফেররান তোরেসের করা একমাত্র অনবদ্য গোলটি স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয় নিশ্চিত করে এবং সেই সঙ্গে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয় কোটি কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের স্বপ্ন।