এদিন বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী চূড়ান্ত লড়াইয়ে লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মাঠে নামতে প্রস্তুত ইউরোপের অন্যতম নান্দনিক ফুটবলের দেশ স্পেন। এই ঐতিহাসিক, রোমাঞ্চকর ও স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ের জন্য স্পেনের প্রধান প্রশিক্ষক লুইস দে লা ফুয়েন্তে তার শুরুর একাদশ জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন।
তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ফুটবলের এই বিশ্বমঞ্চের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মহারণে তিনি তার দলে নতুন কোনো চমক বা অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন আনেননি। বরং বিগত ম্যাচগুলোর অভাবনীয় সাফল্যের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত এবং সুপরীক্ষিত একটি দল নিয়েই তিনি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করার সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
বিশ্বকাপের মতো একটি বৃহৎ আসরের ফাইনালে দল সাজানো নিয়ে সাধারণত ফুটবলপ্রেমী, ক্রীড়া সাংবাদিক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা ও উত্তেজনা বিরাজ করে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন হয়তো প্রতিপক্ষের শক্তি বিবেচনা করে স্প্যানিশ প্রশিক্ষক কৌশলগত কোনো বড় পরিবর্তন আনতে পারেন।
কিন্তু লুইস দে লা ফুয়েন্তে সেই সমস্ত জল্পনাকে উড়িয়ে দিয়ে নিজের আস্থার জায়গাটিকেই সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রেখেছেন। টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল এবং সেমিফাইনালের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ ও প্রবল চাপের ম্যাচগুলোতে যে এগারোজন লড়াকু খেলোয়াড় মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের প্রমাণ করে দলকে ফাইনালে তুলে এনেছেন, তাদের ওপরই তিনি শিরোপা জয়ের চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য নিরঙ্কুশ ভরসা রেখেছেন।
একটি বিজয়ী সংমিশ্রণ ভেঙে ফেলার কোনো যৌক্তিকতা তিনি দেখেননি। স্পেনের এই কৌশলগত স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, দলগত বোঝাপড়া এবং নিজেদের সহজাত খেলার রীতির ওপর তারা কতটা আত্মবিশ্বাসী।
দলের কৌশলগত দিক এবং খেলোয়াড়দের অবস্থানগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্পেনের মধ্যমাঠে শুরুর একাদশে জায়গা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা থাকলেও প্রশিক্ষক তার পূর্বের সিদ্ধান্তেই অবিচল থেকেছেন।
তরুণ, উদীয়মান ও অত্যন্ত প্রতিভাবান খেলোয়াড় পেদ্রিকে বেঞ্চে রেখে ফাবিয়ান রুইজকেই মধ্যমাঠের মূল কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। বিগত ম্যাচগুলোতে রুইজের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অসামান্য ক্ষমতা এবং দূরপাল্লার শটের দক্ষতাই মূলত তাকে প্রথম পছন্দে পরিণত করেছে।
অন্যদিকে, দলের রক্ষণভাগের ডান প্রান্তে যথারীতি প্রহরীর মতো দায়িত্ব পালন করবেন পেদ্রো পোরো। প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ করার পাশাপাশি নিজেদের আক্রমণ শানাতে প্রান্তিক সীমানা দিয়ে বল নিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ ও কার্যকরী ভূমিকা পালন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
স্পেনের আক্রমণাত্মক কৌশলের অন্যতম প্রধান ভরসা এবং দলের প্রাণভোমরা হিসেবে আক্রমণাত্মক মধ্যমাঠের খেলোয়াড়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন দানি ওলমো। খেলার মাঠে তার নিজস্ব সৃজনশীলতা, বল নিয়ে কারুকাজ এবং আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের জন্য গোলের পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করার অসামান্য দক্ষতা স্পেনের শিরোপা জয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নির্ণায়ক হতে পারে।
কোনো প্রকার তালিকা ছাড়াই পুরো দলের গঠন যদি বিস্তারিতভাবে একটি কাঠামোর মধ্যে লক্ষ করা যায়, তবে দেখা যায় গোলপোস্টকে সব ধরনের বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখার গুরুদায়িত্বে থাকবেন বিশ্বস্ত গোলরক্ষক উনাই সিমন।
তার ঠিক সামনে স্পেনের রক্ষণভাগকে দুর্ভেদ্য এক দেয়াল হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুত থাকবেন পেদ্রো পোরো, পাউ কুবার্সি, আইমেরিক লাপোর্তে এবং মার্ক কুকুরেয়া। এই চার রক্ষণভাগের খেলোয়াড়ের পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং মাঠের লড়াইয়ে বল কেড়ে নেওয়ার নিখুঁত দক্ষতার ওপরই নির্ভর করবে প্রতিপক্ষের দুর্ধর্ষ আক্রমণগুলো প্রতিহত করার মূল সাফল্য।
মাঠের মাঝখান থেকে খেলার নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, বলের দখল নিজেদের পায়ে রাখা এবং আক্রমণের নিপুণ রূপরেখা তৈরি করার জন্য স্পেনের মধ্যমাঠে একযোগে কাজ করবেন রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ, দানি ওলমো এবং অ্যালেক্স বায়েনা।
এই চৌকস ও পরিশ্রমী খেলোয়াড়রা যেমন রক্ষণভাগকে বাড়তি নিরাপত্তা দেবেন, তেমনি নিখুঁত পাসের মাধ্যমে বলের জোগান দিয়ে প্রতিপক্ষের শিবিরে প্রবল ভীতি সঞ্চার করবেন। সর্বশেষ, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে গোল আদায় করার জন্য স্পেনের আক্রমণভাগের একেবারে সামনের সারিতে থাকবেন বর্তমান ফুটবল বিশ্বের তরুণ ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী তারকা লামিন ইয়ামাল এবং দলের অভিজ্ঞ আক্রমণভাগের খেলোয়াড় মিকেল ওয়ারজাবাল।
এই দুই খেলোয়াড়ের ক্ষিপ্র গতি, পায়ের জাদু এবং লক্ষ্যভেদী শটের ওপর স্পেনের বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের সোনালি স্বপ্ন অনেকটাই নির্ভরশীল। সব মিলিয়ে, কোনো প্রকার চমক ছাড়াই নিজেদের শক্তির ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে এক সুসংগঠিত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পরীক্ষিত দল নিয়ে বিশ্বজয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্যে মাঠে নামতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত স্পেন। এখন কেবলই সময়ের অপেক্ষা, সবুজ গালিচার মাঠের লড়াইয়ে স্পেনের এই চেনা তারকারা কীভাবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে সোনালি ট্রফিটি নিজেদের করে নেন।