সোমবার, জুলাই ২০, ২০২৬
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই বার চুরির পর আজও নিখোঁজ বিশ্বকাপের প্রথম ট্রফি জুলে রিমে

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম

দুই বার চুরির পর আজও নিখোঁজ বিশ্বকাপের প্রথম ট্রফি জুলে রিমে
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম ট্রফিটি আজও এক গভীর ও অমীমাংসিত রহস্য হয়ে আছে। ১৯৮৩ সালে দ্বিতীয়বারের মতো চুরি যাওয়ার পর থেকে এই মহামূল্যবান ঐতিহাসিক ট্রফিটির আর কোনো সন্ধান মেলেনি।

 

বিশ্বের কোন প্রান্তে, কার ব্যক্তিগত সংগ্রহে কিংবা কোন নিভৃত গোপন স্থানে এটি সযত্নে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তা আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ অজানা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ক্রীড়া বিশ্লেষকদের অনেকেই ধারণা করেন, চুরির পর দুর্বৃত্তরা হয়তো এই খাঁটি স্বর্ণের ট্রফিটি গলিয়ে বাজারে বিক্রি করে ফেলেছে।

 

তবে দীর্ঘ চার দশক পেরিয়ে গেলেও এই দাবির সপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট, যৌক্তিক বা শক্তিশালী আইনি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা এই একই ট্রফি এর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা থেকে রক্ষা পেয়েছিল সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায়।

 

শুধু তাই নয়, এর আগে আরও একবার চুরি যাওয়ার পর একটি সাধারণ কুকুরের কল্যাণে তা অবিশ্বাস্যভাবে উদ্ধারও হয়েছিল। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৩০ সালে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়েতে যখন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবলের জমকালো আসর বসে, তখন এই ট্রফিটির আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ভিক্টরি’।

 

তবে তৎকালীন সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি ‘কাপ দ্যু মঁদ’ বা ফরাসি ভাষায় বিশ্বকাপ নামেই বেশি পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার ইতিহাসের অন্যতম সফল ও দীর্ঘমেয়াদি সভাপতি জুলে রিমের অসামান্য অবদানের প্রতি গভীর সম্মান জানিয়ে এর নামকরণ করা হয় ‘জুলে রিমে ট্রফি’।

 

১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপে পরপর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে ট্রফিটি নিজেদের করে নেয় ইউরোপের দেশ ইতালি। ঠিক সেই সময়েই বিশ্বজুড়ে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ দামামা।

 

চরম উন্মত্ত নাৎসি বাহিনী মহামূল্যবান এই ট্রফিটি যেকোনো সময় লুট করে নিতে পারে-এমন প্রবল আশঙ্কা থেকে তৎকালীন শীর্ষ ইতালীয় ফুটবল কর্মকর্তা এবং ফিফার সহসভাপতি অত্তোরিনো বারাসি এক দুঃসাহসিক ও অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

 

তিনি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে রোমের একটি সুরক্ষিত ব্যাংকের ভল্ট থেকে ট্রফিটি সরিয়ে নিজের শোয়ার ঘরের বিছানার নিচে একটি অতি সাধারণ জুতার বাক্সে লুকিয়ে রাখেন। বিশ্বযুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়ে ট্রফিটি সেখানেই অত্যন্ত সুরক্ষিত ও লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল এবং যুদ্ধ শেষে তা পুনরায় সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ফিফার কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।

 

যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি পেরিয়ে ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশ হিসেবে নির্বাচিত হয় ইংল্যান্ড। বৈশ্বিক এই টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার ঠিক চার মাস আগে লন্ডনের একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রদর্শনীতে জুলে রিমে ট্রফিটি জনসমক্ষে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছিল।

 

কিন্তু ২০ মার্চ আকস্মিকভাবে দেখা যায়, কড়া নিরাপত্তা এড়িয়ে প্রদর্শনী কেন্দ্র থেকে ট্রফিটি রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে। এই অভাবনীয় ঘটনায় গোটা ফুটবল বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সম্মান রক্ষার্থে ও চোরকে ধরতে ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক তদন্ত শুরু করে এবং নানা জায়গায় ফাঁদ পাতে।

 

কিন্তু নিখোঁজ ট্রফির কোনো কূলকিনারা তারা করতে পারেনি। ঠিক এক সপ্তাহ পর, ২৭ মার্চ ডেভিড করবেট নামের এক সাধারণ নাগরিক তার পোষা কুকুর পিকলসকে নিয়ে সকালে রাস্তায় হাঁটতে বের হন। হাঁটার একপর্যায়ে একটি পার্ক করা গাড়ির পাশে খবরের কাগজ এবং দড়িতে শক্তভাবে মোড়ানো একটি প্যাকেট শুঁকে কুকুরটি অস্বাভাবিকভাবে ডাকাডাকি শুরু করে।

 

কৌতূহলী হয়ে ডেভিড করবেট প্যাকেটটি খুলে দেখেন এবং বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। তিনি দেখতে পান, প্যাকেটের ভেতরেই সযত্নে রাখা রয়েছে সেই নিখোঁজ জুলে রিমে ট্রফি! এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের পর পিকলস রাতারাতি পুরো ইংল্যান্ডে অভাবনীয় তারকাখ্যাতি লাভ করে। সংবাদপত্র থেকে টেলিভিশন-সব মাধ্যমেই কুকুরটিকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রচারিত হয়।

 

এমনকি সেবার ইংল্যান্ড যখন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয় করে, তখন বিজয় উদ্‌যাপনের বিশেষ ভোজেও পিকলসকে সম্মানীয় অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ফিফার তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ তিনবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করলে জুলে রিমে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে তাদের নিজস্ব মালিকানায় চলে যাওয়ার বিধান ছিল।

 

১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ব্রাজিল প্রথমবারের মতো তিনবার বিশ্বকাপ জয়ের অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়ে এবং শর্ত অনুযায়ী ট্রফিটি স্থায়ীভাবে লাভ করে। এরপর থেকে ট্রফিটি চিরস্থায়ীভাবে রিও ডি জেনিরোতে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তরে অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি বুলেটপ্রুফ কাচের প্রকোষ্ঠে প্রদর্শনের জন্য রাখা ছিল।

 

কিন্তু ১৯৮৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে ট্রফিটি দ্বিতীয়বারের মতো চুরি হয়ে যায়। পরবর্তীতে ব্যাপক পুলিশি অভিযানের পর এই চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজন অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি প্রদান করা হলেও, সেই ঐতিহাসিক ট্রফিটির আর কোনো অস্তিত্ব আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি।

 

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মহলের আজও বদ্ধমূল বিশ্বাস যে, ঐতিহাসিক মূল্যের কথা বিবেচনা করে ট্রফিটি হয়তো এখনো বিশ্বের কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে লোকচক্ষুর অন্তরালে সযত্নে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তবে দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও এই তত্ত্বের সপক্ষে আজ অবধি কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা সূত্র আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

 

ফলস্বরূপ, ১৯৮৩ সালের সেই অন্ধকার রাতের পর থেকে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক এই ট্রফিটির চূড়ান্ত পরিণতি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী অমীমাংসিত রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে।