বিশ্বজয়ের মুকুট টানা দ্বিতীয়বারের মতো নিজেদের ঘরে তোলার এক অদম্য লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামতে প্রস্তুত বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আলবিসেলেস্তেরা। তবে এমন একটি স্নায়ুক্ষয়ী ও ঐতিহাসিক ম্যাচের আগে দল সাজাতে গিয়ে আর্জেন্টিনার সুযোগ্য ও মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
সেমিফাইনালে শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই-এক গোলের ব্যবধানে দুর্দান্ত জয় পাওয়া সেই দলটির শুরুর একাদশে তিনি নিয়ে এসেছেন তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তবে দলের প্রাণভোমরা, আক্রমণের মূল অস্ত্র এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী অধিনায়ক লিওনেল মেসি যথারীতি শুরু থেকেই মাঠে থাকছেন, যা পুরো দলের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অগণিত ভক্তদের জন্য পরম স্বস্তির বিষয়।
কৌশলগত দিক থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি এসেছে রক্ষণভাগের ডান প্রান্তে। কোচ লিওনেল স্কালোনি দলের এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পরিবর্তন আনার অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা নাহুয়েল মলিনার জায়গায় শুরুর একাদশে সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে পরীক্ষিত ও অভিজ্ঞ গঞ্জালো মন্তিয়েলকে।
গত ম্যাচে অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদের খেলোয়াড় মলিনা নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। তার রক্ষণ সামলানোর চরম ঘাটতির সুযোগ নিয়েই ইংলিশ আক্রমণভাগ সেই প্রান্ত দিয়ে ভীতি ছড়িয়েছিল এবং একটি গোলও আদায় করে নিয়েছিল। এই কৌশলগত ত্রুটি স্কালোনির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ায়নি।
অন্যদিকে, সেমিফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে রিভার প্লেটের সাবেক এই তারকা খেলোয়াড় মন্তিয়েল নিজের সেরা খেলাটা প্রদর্শন করেছেন। অসাধারণ পারফরম্যান্স এবং জমাট রক্ষণের মাধ্যমে তিনি কোচের পূর্ণ আস্থা অর্জন করেছেন এবং তারই চূড়ান্ত পুরস্কার হিসেবে মেগা ফাইনালের মূল একাদশে জায়গা করে নিয়েছেন।
দলের মাঝমাঠের রসায়নেও বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে, যা স্পেনের নান্দনিক ফুটবলের বিপক্ষে অত্যন্ত জরুরি ছিল। আর্জেন্টিনার শুরুর একাদশে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হলো দলের অন্যতম ভরসার প্রতীক রদ্রিগো দে পলের অভাবনীয় প্রত্যাবর্তন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে তাকে শুরুর একাদশে রাখা হয়নি, যা অনেক ফুটবল বিশ্লেষককেই অবাক করেছিল। তবে স্পেনের মতো বল দখলে পারদর্শী ও শক্তিশালী দলের মাঝমাঠের সঙ্গে পাল্লা দিতে তার মতো অদম্য, পরিশ্রমী ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের উপস্থিতি অপরিহার্য।
তাই জিউলিয়ানো সিমিওনেকে বসিয়ে এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ফাইনালে দে পলকে আবারও শুরুর একাদশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তার এই অন্তর্ভুক্তি দলের সার্বিক ভারসাম্য, রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা এবং মধ্যমাঠের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণকে আরও বেশি সুসংহত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সবশেষ এবং তৃতীয় পরিবর্তনটিতে রয়েছে এক দারুণ চমক, যা মূলত শারীরিক সুস্থতাজনিত কারণে অনেকটাই বাধ্য হয়েই নিতে হয়েছে কোচকে। মাঝমাঠের অন্যতম বিশ্বস্ত সেনানি লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে ফাইনালের শুরুর একাদশ থেকে ছিটকে পড়তে হয়েছে। দলীয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, শারীরিকভাবে তিনি শতভাগ উপযুক্ত অবস্থায় নেই।
বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং শারীরিক সক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষার ম্যাচে পুরোপুরি সুস্থ নন এমন কাউকে খেলিয়ে বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নিতে চাননি স্কালোনি। পারেদেসের এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে নিকোলাস গঞ্জালেজকে।
উল্লেখ্য, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে গঞ্জালেজ দারুণ কিছু আক্রমণ রচনা করেছিলেন এবং নিজ নৈপুণ্যে বেশ কয়েকটি গোলের পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করে সবার নজর কেড়েছিলেন। তার এই আক্রমণাত্মক মানসিকতা এবং গতিশীলতা স্পেনের রক্ষণভাগকে চাপে ফেলতে দারুণভাবে সাহায্য করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে একটি নিখুঁত, গতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ দল নিয়েই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। আলাদা কোনো তালিকা ছাড়াই পুরো একাদশটি যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় গোলপোস্টের নিচে যথারীতি আস্থার পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন অতিমানবীয় এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।
তার ঠিক সামনে রক্ষণদুর্গ সামলানোর গুরুদায়িত্বে থাকবেন গঞ্জালো মন্তিয়েল, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ এবং নিকোলাস তাগলিয়াফিকো। মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ করা এবং নিজেদের আক্রমণ শানানোর সেতুবন্ধন হিসেবে প্রস্তুত থাকবেন রদ্রিগো দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস মাক অ্যালিস্টার এবং নিকোলাস গঞ্জালেজ।
আর আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দেবেন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি এবং তার অত্যন্ত যোগ্য তরুণ সঙ্গী হুলিয়ান আলভারেজ। এই দুর্দান্ত ও সুসংগঠিত একাদশ নিয়ে স্পেনকে পরাজিত করে আরও একবার বিশ্বজয়ের আনন্দে মেতে ওঠার এবং সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পরম অপেক্ষায় এখন পুরো আর্জেন্টিনা দল।