তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, সংসদ অধিবেশনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় কাজ হতে পারে না এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সংসদীয় কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা চলাকালে স্পিকার এই কড়া নির্দেশনা জারি করেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতি সমুন্নত রাখতে স্পিকারের এই কঠোর অবস্থানকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অধিবেশনে স্পিকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, মন্ত্রীরা প্রায়শই রাষ্ট্রীয় কাজের ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে সংসদের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা জারি করে বলেন, তাদের অবশ্যই যথাসময়ে সংসদে উপস্থিত থাকতে হবে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা যখন দেশ ও জনগণের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া, অভাব-অভিযোগ এবং স্থানীয় সমস্যাগুলো তুলে ধরেন, তখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সেখানে উপস্থিত থেকে সেগুলো মনোযোগ সহকারে শোনা এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা তাদের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।
স্পিকারের এই কঠোর নির্দেশনার মূল প্রেক্ষাপট তৈরি হয় বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্থাপনের মাধ্যমে। সংসদে আলোচনার পরিবেশ ও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন যে, বাজেট অধিবেশনের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনেক মন্ত্রীই সংসদে উপস্থিত থাকেন না।
বিশেষ করে যেসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছে সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার জনগণের দাবি-দাওয়া পেশ করেন, তাদের অনুপস্থিতি সংসদীয় কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করে।
একই সঙ্গে তিনি অধিবেশন কক্ষের ভেতরে সংসদ সদস্যদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে গল্প করা বা বৈঠক করার বিষয়েও স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এতে সংসদের পবিত্রতা, স্বাভাবিক পরিবেশ এবং শৃঙ্খলা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
বিরোধীদলীয় নেতার এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি অধিবেশন কক্ষের ভেতরে যেকোনো ধরনের দলবদ্ধ আলোচনা এবং নিয়মবহির্ভূত চলাচল বন্ধ করার জন্য কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন এবং সংসদের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সবার সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেন।
এদিকে, মঙ্গলবারের অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের দাপ্তরিক কাজ পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়ও আলোচনায় আসে। রাজশাহী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান একটি নোটিশের মাধ্যমে স্পিকারকে জানান যে, নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার পর চার মাস পেরিয়ে গেলেও সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদের নাম এবং যোগাযোগ নম্বর সংবলিত কোনো সহায়িকা বা ডাইরেক্টরি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এই তথ্যভাণ্ডারের অভাবে সংসদ সদস্যদের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এর জবাবে স্পিকার সংসদকে অবহিত করেন যে, জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে টেলিফোন সহায়িকা প্রকাশের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য এখনো তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ না করায় এই প্রকাশনায় অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব ঘটছে। সংসদীয় কমিটিগুলো গঠিত হওয়ার পর পরই এটি প্রকাশিত হবে জানিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের দ্রুত তাদের তথ্য জমা দেওয়ার আহ্বান জানান।
এই একই ইস্যুতে সংসদের চিফ হুইপ জানান যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঠিক ও হালনাগাদ যোগাযোগ নম্বর না থাকার কারণে সংসদ সদস্যদের রাষ্ট্রীয় ও দাপ্তরিক কাজে প্রতিনিয়ত নানা জটিলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ডাইরেক্টরি তৈরির বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেন। চিফ হুইপের এই প্রস্তাবের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন নম্বর সংবলিত একটি পূর্ণাঙ্গ ও সম্মিলিত ডাইরেক্টরি সংসদ সদস্যদের ব্যবহারের সুবিধার্থে অতি দ্রুত প্রস্তুত করে সরবরাহ করা হবে।
অধিবেশনের অন্য একটি পর্যায়ে পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক ইস্যু উত্থাপন করেন।
তিনি প্রবীণ রাজনীতিবিদ মির্জা আব্বাসের বর্তমান শারীরিক অবস্থা, ঋণখেলাপির মামলায় অভিযুক্ত সরকারদলীয় দুজন সংসদ সদস্যের অবস্থান এবং সাম্প্রতিক সময়ে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক গুজব প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দাবি করেন।
তবে চিফ হুইপ তাৎক্ষণিকভাবে এই আলোচনার বিরোধিতা করে বলেন, বাজেট অধিবেশনের মতো একটি নির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট আলোচনার মধ্যে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এবং বাইরের বিষয় নিয়ে কথা বলে সংসদের মহামূল্যবান সময় নষ্ট করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
স্পিকারও চিফ হুইপের এই যৌক্তিক অবস্থানের সঙ্গে পূর্ণ একমত পোষণ করেন। স্পিকার সংসদকে নিশ্চিত করেন যে, প্রবীণ নেতা মির্জা আব্বাস লিখিতভাবে জানিয়েছেন তার শারীরিক অবস্থার ক্রমশ উন্নতি ঘটছে এবং পুরোপুরি সুস্থ হলেই তিনি অধিবেশনে যোগ দেবেন।
এছাড়া আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলা বা ভিত্তিহীন গুজব নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন। কোনো সংসদ সদস্যের পদ আইনগতভাবে বাতিল হলে তা যথাসময়ে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সংসদকে অবহিত করা হবে বলে তিনি তাঁর রুলিংয়ে উল্লেখ করেন।