রবিবার, জুলাই ১৯, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও প্রবাসীদের জন্য আগামী মাসে চালু হচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম

রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও প্রবাসীদের জন্য আগামী মাসে চালু হচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’
ছবি: সংগৃহীত

বৈদেশিক কর্মসংস্থানে যুক্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার এবং নানামুখী রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার।

 

আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত ‘প্রবাসী কার্ড’-এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম বা পাইলট প্রজেক্টের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

 

প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পের আওতায় একটি আধুনিক ডেবিট কার্ড চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং লেনদেন সহজ করার পাশাপাশি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ধরনের এক্সক্লুসিভ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করবে।

 

শনিবার, ১৮ জুলাই দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে তাঁর কার্যালয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বিশেষ সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন গণমাধ্যমকে সরকারের এই নতুন কল্যাণমুখী পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

 

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অঙ্গীকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্রবাসীদের কল্যাণে এই কার্ডের প্রবর্তন করা। এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বসাধারণের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড এবং ক্রীড়াবিদদের জন্য ক্রীড়া কার্ডের মতো জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা শুরু হয়েছে।

 

তারই ধারাবাহিকতায় এবার রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ক্ষমতায়ন ও অধিকার সুরক্ষায় ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর এই উদ্যোগ নেওয়া হলো। এই কার্ড প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা, তাদের অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বী করে তোলা এবং বিশেষ ডুয়াল কারেন্সি কার্ডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা দেওয়া, যাতে প্রবাসীরা সরাসরি ও নিরাপদে দেশে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ পাঠাতে পারেন।

 

উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ ১০টি সুবিধার কথা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন। এই কার্ডের আওতায় প্রবাসীরা দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাউঞ্জ ব্যবহারের কমপ্লিমেন্টারি সুবিধা পাবেন।

 

পাশাপাশি, বিমানবন্দরে ঝামেলাহীন যাতায়াতের জন্য বিশেষ ইমিগ্রেশন বুথের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে সেবা প্রদান এবং বিমানবন্দরে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ সংবর্ধনা বা ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ সেবা নিশ্চিত করা হবে।

 

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বিমানের টিকিট ক্রয়, হোটেল বুকিং এবং দেশ-বিদেশে ন্যায্যমূল্যে গাড়ি বুকিংয়ের ক্ষেত্রে কার্ডধারীরা বিশেষ আকর্ষণীয় ছাড় বা ডিসকাউন্ট সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। এমনকি প্রিমিয়াম সিগনেচার কার্ডধারী প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দর থেকে আসা-যাওয়ার সুবিধার্থে বিশেষ ‘পিক অ্যান্ড ড্রপ’ সেবাও চালু করা হবে।

 

স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবন সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এই কার্ডটি প্রবাসীদের জন্য একটি অত্যন্ত বড় ও নির্ভরযোগ্য অবলম্বন হিসেবে কাজ করবে। দেশের সকল সরকারি হাসপাতালে প্রবাসীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘প্রবাসী সেবা বুথ’ স্থাপন করা হবে এবং দেশের বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা থাকবে।

 

অত্যন্ত মানবিক একটি সিদ্ধান্ত হিসেবে, কোনো প্রবাসী কর্মীর প্রবাসে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হলে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে ও বিনা মূল্যে তার মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা এই কার্ডের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।

 

এর পাশাপাশি প্রবাসফেরত নাগরিকদের দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ, বিশেষ বিমা সুবিধা, ক্রেডিট স্কোরিং ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং অর্জিত রেমিট্যান্সের ওপর বিশেষ রিওয়ার্ড পয়েন্টের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে এই নতুন প্রকল্পে।

 

নাগরিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও কার্ডধারীদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রবাসীরা তাদের নিজ নামে জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, বিভিন্ন লাইসেন্স গ্রহণ এবং বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক বা বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবেন।

 

একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন বা প্রাপ্তি, নতুন পাসপোর্ট তৈরি ও নবায়ন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস বা হাইকমিশনগুলো থেকে কনস্যুলার সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রবাসী কার্ডধারীরা বিশেষ ও দ্রুততম সেবা লাভ করবেন।

 

সরকারের এই মহাপরিকল্পনাটি বেশ কয়েকটি ধাপে সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী মাসের মাঝামাঝিতে প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে এই প্রবাসী ডেবিট কার্ডটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্যু করা হবে।

 

চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে অন্তত ৫০ হাজার প্রবাসীকে এই কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে এবং আগামী ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে কার্ডের সংখ্যা বাড়িয়ে ২ লাখ প্রবাসীর মাঝে বিতরণ করার একটি বড় টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

প্রথম পর্যায়ের এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের সফল সমাপ্তির পর, দ্বিতীয় পর্যায়ে দেশের প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে এই প্রবাসী কার্ডের যাবতীয় ব্যাংকিং ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে পরিচালনা করা হবে।

 

শনিবার অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে আরও বেশি সময়োপযোগী, গতিশীল ও আধুনিক করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

 

একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রতিটি বাংলাদেশি প্রবাসী নাগরিক যেন ক্রমান্বয়ে এই বিশেষায়িত প্রবাসী কার্ডের সার্বিক সুবিধার আওতায় আসতে পারেন, সে বিষয়েও তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখার আহ্বান জানান।

 

বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ও মাহদী আমিন, প্রবাসী কল্যাণ সচিব মোখতার আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান এবং বিএমইটির মহাপরিচালক জামিল আহমেদসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।