সোমবার, অক্টোবর ৫, ২০২৬
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান করছে সরকার - প্রধানমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:০৮ পিএম

প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান করছে সরকার - প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা এবং সিটি কর্পোরেশনের জন্য একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিপুল আবাসন চাহিদা মেটানো এবং দশকের পর দশক ধরে চলে আসা অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট বহুমুখী সংকট নিরসনের লক্ষ্যে এই যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

নিরাপদ, সর্বজনীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জলবায়ু-সহনশীল এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নগরকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য পর্যাপ্ত, ঝুঁকিমুক্ত ও সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের এই মেগা-পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশের জন্য এমন দেশব্যাপী নগর মহাপরিকল্পনা অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ। ‘বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬’ উপলক্ষ্যে এক বিশেষ বাণীতে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

 

বিশ্বব্যাপী পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও বাসযোগ্য মানববসতি গড়ে তোলার সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই মূলত এই দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালন করা হয়ে থাকে।

 

উল্লেখ্য, জাতিসংঘ ঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’-এই সুনির্দিষ্ট প্রত্যয়কে সামনে রেখে এবারও বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

 

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেন, বর্তমান বিশ্বে দ্রুতগতির নগরায়ণ, বিপুল জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং এর বিপরীতে ক্রমবর্ধমান আবাসন চাহিদার যে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, তার আলোকে জাতিসংঘের ঘোষিত এবারের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।

 

সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত এবং মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই নগরায়ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার।

 

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে এই বিষয়টির ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বলেন, এই বৃহৎ লক্ষ্য অর্জনের জন্য আবাসন খাত, নগর পরিকল্পনা, আধুনিক নাগরিক সেবা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতাকে এক সুতোয় গেঁথে দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

 

তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, একটি সমন্বিত ও সুষম নগর উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর নগরজীবন নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বিশেষ করে সমাজের নিম্ন আয়ের প্রান্তিক মানুষের জন্য সম্মানজনক আবাসন নিশ্চিত করা এবং রাজধানী ও প্রান্তিক শহরগুলোর মধ্যে সুষম নগর উন্নয়নকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যাতে কোনো নাগরিককেই উন্নয়নের মূলধারা থেকে ছিটকে পড়তে না হয়।

 

একটি আদর্শ নগরব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, সেটির বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি নাগরিকের জন্য কেবল একটি পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিত করাই শেষ কথা নয়; বরং এর পাশাপাশি এমন একটি নগর ও সামাজিক বসতি গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি মানুষ তাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আধুনিক নাগরিক সেবা, একটি সুস্থ ও দূষণমুক্ত পরিবেশ এবং সর্বোপরি একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সমান সুযোগ পাবে।

 

বিশ্ব বসতি দিবস প্রতি বছর রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে সেই মৌলিক ও মানবিক দায়িত্বের কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। মানববসতিকে কেবল ইট-পাথরের কাঠামো হিসেবে না দেখে তাকে একটি প্রাণবন্ত সামাজিক বাস্তুতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

 

বর্তমানে বাংলাদেশের নগরজীবনের নানা জটিলতার কথা অকপটে স্বীকার করে সরকারপ্রধান বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রধান শহর ও নগরগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে।

 

কিন্তু এই দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, তীব্র যানজট, ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার তুলনায় অপর্যাপ্ত নাগরিক সেবা, তীব্র আবাসন সংকট এবং সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে আসা অভিবাসীদের চাপ নগরজীবনে নানা ধরনের জটিল ও কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

 

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে উপকূলীয় ও চরাঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিনিয়ত শহরমুখী হচ্ছে, যা বিদ্যমান নগরকাঠামো এবং সম্পদের ওপর এক বিশাল ও অপ্রত্যাশিত চাপ সৃষ্টি করছে।

 

এই পাহাড়সম চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহারে সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবার ও বস্তিবাসীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে।

 

দেশের বস্তিবাসীদের দীর্ঘদিনের মানবেতর জীবনযাপন থেকে বের করে এনে তাদের জন্য আবাসনের বৈধ মালিকানা অর্জনের এক যুগান্তকারী সুযোগ সৃষ্টি করা এবং নগরে সমন্বিত নিরাপদ পানি সরবরাহ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও বর্তমান সরকার অক্ষরে অক্ষরে পালনের সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

‘সবার জন্য বাসস্থান’ বা সকলের জন্য বাসস্থানের অধিকারকে সরকার কেবল চার দেয়ালের একটি আচ্ছাদনের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখছে না। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলেন, একটি বাসস্থানের পূর্ণতা তখনই আসে যখন সেখানে নিরাপদ পানীয় জল, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং প্রাত্যহিক জীবনের জন্য অপরিহার্য নাগরিক সেবার সমন্বিত নিশ্চয়তা থাকে। সরকার বাসস্থানের এই পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞাকেই ধারণ করে অগ্রসর হচ্ছে।

 

আর এই পরিকল্পিত ও পূর্ণাঙ্গ নগরায়ণের লক্ষ্যেই দেশের প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন এবং জেলা পর্যায়ে অভিজ্ঞ নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে, যা আগামী দশকের নগর কাঠামোর শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

 

সুষম নগর উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, কেবল রাজধানী নির্ভরতা কমিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নয়ন ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জে নতুন করে স্বাধীন ও ক্ষমতাসম্পন্ন নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে।

 

এই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোর মাধ্যমে পরিকল্পিত ও সুষম নগর উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আরও বেশি শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করা হচ্ছে। সরকারের এই বহুমুখী প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত উদ্যোগগুলো কেবল একটি নিরাপদ, সর্বজনীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই নগর গড়ে তোলার ক্ষেত্রেই অবদান রাখবে না, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি-১১ (সাসটেইনেবল সিটিস অ্যান্ড কমিউনিটিস) অর্জনে বাংলাদেশের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে।

 

তবে একটি রাষ্ট্রের পক্ষে কেবল সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে এত বিশাল ও বহুমুখী কর্মযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। টেকসই আবাসন ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয় বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী একটি সমন্বিত ও অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

 

তিনি বলেন, এই বৃহৎ লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারী, স্থানীয় সচেতন জনগোষ্ঠী, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের স্বতঃস্ফূর্ত ও সমন্বিত অংশগ্রহণ একান্ত অপরিহার্য।

 

বিশেষ করে সমাজের নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষের আবাসন সংকট নিরসন, বস্তিগুলোর জীবনমান উন্নয়ন, নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি নগর পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি মডেল অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।

 

পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী তাঁর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দর্শনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি বৈষম্যহীন ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে নগর ও গ্রাম নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি মানুষ সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন, প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয় সব নাগরিক সেবা এবং একটি সুস্থ, পরিচ্ছন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বসবাসের সমান সুযোগ লাভ করবে।

 

একটি পরিকল্পিত ও সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, মানবিক, বাসযোগ্য ও আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সম্পূর্ণ টেকসই আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই তাঁর সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বিশ্ব বসতি দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে গৃহীত সকল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মসূচির সার্বিক সাফল্য কামনা করে তাঁর সুচিন্তিত বাণী সমাপ্ত করেন।