বুধবার, অক্টোবর ৭, ২০২৬
২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশু অধিকার দিবস ও শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২৮ এএম

শিশু অধিকার দিবস ও শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে এক উৎসবমুখর এবং আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে ‘শিশু অধিকার দিবস ২০২৬’। একই সঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে দেশের শিশুদের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতা বিকাশের প্রধান জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিশু একাডেমির গৌরবোজ্জ্বল ৫০ বছর পূর্তি বা সুবর্ণজয়ন্তী।

 

এই যুগপৎ ও ঐতিহাসিক আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত, শিক্ষিত ও সমৃদ্ধ করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আয়োজিত এই জাতীয় অনুষ্ঠানে সরকারপ্রধানের সরাসরি উপস্থিতি শিশুদের মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনা ও আনন্দের সঞ্চার করেছে।

 

একটি জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে শিশুদের গড়ে তোলার যে নিরন্তর সংগ্রাম, আজকের এই আয়োজন তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সকালবেলা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছালে এক মনোমুগ্ধকর ও আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়।

 

শিশু একাডেমির আঙিনায় অপেক্ষমাণ প্রায় দেড় শতাধিক শিশু পরম মমতা ও উচ্ছ্বাসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে ফুলেল অভ্যর্থনা জানিয়ে বরণ করে নেয়। শিশুদের এই প্রাণবন্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যর্থনায় মুগ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের প্রতি গভীর স্নেহ ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করেন।

 

এরপর সবার উপস্থিতিতে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। জাতীয় সংগীতের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রিত অন্যান্য সম্মানীয় অতিথিদের সঙ্গে নির্ধারিত আসনে উপবেশন করেন এবং মূল আনুষ্ঠানিকতাগুলো মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ শুরু করেন।

 

এই বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সম্মানিত ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান।

 

শিশুদের সার্বিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক কল্যাণে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা ও অসামান্য অবদান এই অনুষ্ঠানকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে। এছাড়া সমগ্র অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

 

তাঁর সুযোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দেশের শিশুদের সার্বিক উন্নয়ন, সুরক্ষা ও অধিকার রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যার সুস্পষ্ট প্রতিফলন আজকের এই সুশৃঙ্খল ও বিশাল আয়োজনে ফুটে উঠেছে।

 

বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর বা সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপন জাতীয় জীবনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা লাখো শিশুর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং মনস্তাত্ত্বিক গঠনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে আসছে।

 

একটি স্বাধীন ভূখণ্ডে শিশুদের জন্য এমন একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই একাডেমির যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা এক সুবিশাল ও সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রী তাঁর উপস্থিতির মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানের অতীত অবদানকে যেমন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছেন, তেমনি আগামী দিনের আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে শিশুদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একাডেমির ভবিষ্যৎ ভূমিকার ওপরও সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিশু অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বরাবরই অত্যন্ত দৃঢ়। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের এই আয়োজন কেবল একটি জাতীয় উৎসব নয়, বরং আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।

 

রাষ্ট্র প্রতিটি শিশুর জন্য একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ, এবং শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তীর এই শুভলগ্নে সেই অঙ্গীকারকেই পুনরায় সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার বিশেষ প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।

 

আজকের এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে শিশুদের নিজেদের পরিবেশনায় একটি বিশেষ ও চমৎকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিশু শিল্পীরা তাদের নৃত্য, সংগীত ও নাটিকার মাধ্যমে বাংলার আবহমান সংস্কৃতি ও শিশুদের রঙিন পৃথিবীর চিত্র সুনিপুণভাবে তুলে ধরে।

 

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিবৃন্দ শিশুদের এই মনোজ্ঞ পরিবেশনা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে উপভোগ করেন। সাংস্কৃতিক পর্বের পাশাপাশি আজকের আয়োজনে শিশুদের বিশেষ স্মারক উপহার প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা তাদের জন্য এক আজীবন লালন করার মতো মধুর স্মৃতি হয়ে থাকবে।

 

এছাড়াও, শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী ও শিশু অধিকার দিবস উপলক্ষ্যে প্রকাশিত বিশেষ স্মরণিকা ‘শৈশব’-এর আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এই স্মরণিকায় শিশুদের নিয়ে লেখা নানা প্রবন্ধ, কবিতা এবং শিশু একাডেমির দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের সাফল্যের ইতিহাস ও ধারাবাহিক পথপরিক্রমার বিস্তারিত বিবরণ স্থান পেয়েছে।

 

আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতায় আজকের অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি মতবিনিময়। রাজধানী ঢাকার মূল অনুষ্ঠানস্থলের বাইরেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সাধারণ শিশুদের সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে যুক্ত হবেন প্রধানমন্ত্রী।

 

এই যুগান্তকারী উদ্যোগের ফলে তৃণমূল পর্যায়ের শিশুরাও সরাসরি তাদের দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে কথা বলার এবং নিজেদের অনুভূতি ও স্বপ্নের কথা প্রকাশের এক বিরল সুযোগ লাভ করবে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে এবং সব শিশুর প্রতি রাষ্ট্রের সমান ও নিবিড় মনোযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগটি একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও অনুকরণীয় পদক্ষেপ।

 

অনুষ্ঠানের পরবর্তী ধাপে প্রধানমন্ত্রী শিশুদের নিজস্ব সৃজনশীলতায় আঁকা ছবি ও বর্ণাঢ্য ফটো গ্যালারি পরিদর্শন করবেন। শিশুদের রং-তুলিতে ফুটে ওঠা স্বপ্নের বাংলাদেশ, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য এবং তাদের নির্মল ভাবনার জগৎ প্রধানমন্ত্রী গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।

 

শিশুদের সৃজনশীল কাজের প্রতি সরকারপ্রধানের এই প্রত্যক্ষ উৎসাহ প্রদান আগামী দিনে দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে নতুন প্রতিভার জন্ম দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আয়োজক ও বিশেষজ্ঞরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। শিশুদের অবচেতন মনের ভাষা বোঝার জন্য শিল্পের চেয়ে শক্তিশালী কোনো মাধ্যম হতে পারে না।

 

মূল অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে অবস্থিত শিশু জাদুঘর ভবনে গমন করবেন। সেখানে তিনি জাদুঘর ভবনের নিচতলায় নবনির্মিত আধুনিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বা সোলার প্যানেল এবং একটি অত্যাধুনিক সাব-স্টেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।

 

এই উদ্যোগটি বর্তমান সরকারের পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সংগতিপূর্ণ। একদিকে শিশুদের জন্য একটি আধুনিক ও তথ্যবহুল জাদুঘর নিশ্চিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দূষণমুক্ত ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

 

সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে শিশু একাডেমি তার নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা অনেকাংশে মেটাতে সক্ষম হবে, যা জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায় একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

 

এবারের শিশু অধিকার দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’। বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে এই প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

 

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই আধুনিক যুগে শিশুরা যেমন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সম্ভাবনার মুখোমুখি হচ্ছে, তেমনি সামাজিক অবক্ষয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের মতো নতুন নতুন চ্যালেঞ্জেরও সম্মুখীন হচ্ছে।

 

তাই একটি সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ বলতে কেবল অন্ন, বস্ত্র বা বাসস্থানের নিশ্চয়তা বোঝায় না, বরং মানসম্মত শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পরিবেশ এবং একটি সুস্থ মানসিক বিকাশের অবারিত সুযোগকেও বোঝায়।

 

বাংলাদেশ সরকার এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জাতীয় শিশু নীতিমালার সফল বাস্তবায়ন, শিশুশ্রম নিরসন, এবং শিশুদের পুষ্টিহীনতা দূরীকরণে নানামুখী দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছে।

 

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী এবং শিশু অধিকার দিবস ২০২৬-এর এই যৌথ আয়োজন কেবল একটি প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি দেশের প্রতিটি শিশুর প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের সামগ্রিক দায়বদ্ধতা পুনর্নবায়নের একটি ঐতিহাসিক দিন।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই আয়োজনের গাম্ভীর্য ও গুরুত্বকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। শিশুদের সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার যে দৃঢ় শপথ আজ শিশু একাডেমির আঙিনা থেকে উচ্চারিত হয়েছে, তা সরকারের নিরলস প্রচেষ্টা এবং সর্বস্তরের জনগণের ঐকান্তিক সহযোগিতায় অচিরেই একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাস্তবে পরিণত হবে।

 

উন্নত, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন সমগ্র জাতি দেখছে, আজকের এই শিশুদের সুরক্ষিত ও সঠিক বিকাশের মাধ্যমেই আগামী দিনে সেই স্বপ্নের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।