রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তাজমিনকে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধে হত্যারহস্য উন্মোচিত, অটোরিকশাচালক গ্রেপ্তার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৩ এএম

তাজমিনকে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধে হত্যারহস্য উন্মোচিত, অটোরিকশাচালক গ্রেপ্তার
ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা জেলায় সংঘটিত এক মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য অবশেষে পরিপূর্ণভাবে উন্মোচিত হয়েছে। চৌদ্দ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে দিকভ্রান্ত করে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে পৈশাচিকভাবে ধর্ষণ ও গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

 

চাঞ্চল্যকর এই অমানবিক ঘটনার পর দেশজুড়ে, বিশেষ করে সমগ্র কুমিল্লা অঞ্চলে ব্যাপক আলোড়ন ও শোকের ছায়া নেমে আসে। শনিবার সকালে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য ও রোমহর্ষক পটভূমি গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া।

 

আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা এবং নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে জড়িত অটোরিকশাচালক সুমনকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মানদণ্ডে পুলিশি তদন্তের এই সাফল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

 

নিহত জান্নাতুল তাজমিন ছিল অত্যন্ত মেধাবী এবং প্রাণোচ্ছল এক কিশোরী। সে কুমিল্লা নগরীর স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিল। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের পর থেকে সে আর কোনো কারণে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়নি।

 

তাজমিনের মূল বাড়ি যশোর জেলার সদর উপজেলাধীন ছাতিয়াতলা গ্রামে। তার বাবা আব্দুল আলিম পেশায় একজন বেসরকারি চাকরিজীবী; তিনি স্বনামধন্য ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রেনেটা লিমিটেডের কুমিল্লা অঞ্চলের দায়িত্বে কর্মরত রয়েছেন।

 

বাবার চাকরির সুবাদেই তাদের পরিবার কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করে আসছিল। সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে ওঠা তাজমিনের জীবন প্রদীপ এভাবে একজন পরিবহন শ্রমিকের লালসার শিকার হয়ে অকালেই নিভে যাবে, তা তার পরিবার কিংবা পরিচিতজনদের কেউই ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি।

 

তাজমিনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি শুরু হয় গত চার অক্টোবর। সেদিন সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে সে নিজ বাসা থেকে বের হয়। এরপর বেশ কয়েকদিন তার কোনো সুনির্দিষ্ট সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজ নিয়েও তার কোনো হদিস পাচ্ছিলেন না।

 

সর্বশেষ গত সাত অক্টোবর, বুধবার দিবাগত রাত বারোটা উনিশ মিনিটের দিকে কুমিল্লা শহরের সুপরিচিত হোটেল নূরজাহানের সামনে তাকে দেখা গিয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকেই সে নিজের গন্তব্য অর্থাৎ রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে একটি অটোরিকশা ভাড়া করে।

 

রাত তখন আনুমানিক সাড়ে বারোটা। এই অটোরিকশাটির চালক ছিল সুমন নামের ওই ঘাতক। একজন কিশোরীকে এত রাতে একা পেয়ে চালক সুমনের মনে জঘন্য অপরাধের চিন্তার উদয় হয়। সে তাজমিনকে তার নির্দিষ্ট গন্তব্য রেসকোর্সের দিকে না নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ভিন্ন পথে চালনা শুরু করে।

 

পদুয়ার বাজার এলাকা পার হওয়ার পর শহরের দিকে না ঢুকে সে অটোরিকশাটিকে কুমিল্লার বিজরার দিকে ঘুরিয়ে নেয়। রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দিকভ্রান্ত করে দীর্ঘ সময় ধরে অটোরিকশাটি নিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরতে থাকে।

 

ঘুরতে ঘুরতে একপর্যায়ে চালক সুমন অটোরিকশাটিকে নিয়ে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি অন্ধকার ও নির্জন গ্রামীণ রাস্তায় প্রবেশ করে। সেখানে জনমানুষের কোনো উপস্থিতি ছিল না এবং পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ সুনসান। ওই নির্জন পরিবেশে সুমন কিশোরী তাজমিনের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানোর চেষ্টা করে।

 

এ সময় নিজের সম্মান ও জীবন রক্ষার্থে তাজমিন প্রাণপণ চেষ্টা চালায় এবং চালকের সঙ্গে তার তীব্র ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এই ভয়াবহ ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ভারসাম্য হারিয়ে অটোরিকশাটি রাস্তার পাশের একটি গভীর ধানখেতে কাত হয়ে উল্টে পড়ে যায়।

 

সুযোগ পেয়ে ভিকটিম তাজমিন দ্রুত সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ ধরে ধস্তাধস্তি এবং ভয়াবহ মানসিক চাপের কারণে সে শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

 

এই সুযোগে পাষণ্ড সুমন তাকে তাড়া করে ধরে ফেলে এবং পুরোপুরি কাবু করে নেয়। এরপর সে অত্যন্ত নির্মমভাবে ওই অসহায় কিশোরীকে ধর্ষণ করে। নিজের এই জঘন্য অপরাধের কথা যেন কেউ জানতে না পারে, সেই উদ্দেশ্যে ধর্ষণের পরপরই ঘাতক সুমন তার কাছে থাকা গামছা দিয়ে তাজমিনের গলায় ফাঁস পেঁচিয়ে তাকে নির্দয়ভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

 

হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর অপরাধী অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। প্রমাণ লোপাট এবং নিজের শরীরের দাগ পরিষ্কার করার জন্য সে পার্শ্ববর্তী এলাকার একটি পুকুরে গিয়ে গোসল সম্পন্ন করে। পালানোর সময় সে ভিকটিমের ভ্যানেটি ব্যাগ তল্লাশি করে তার ব্যবহৃত মূল্যবান আইফোনটি চুরি করে নিয়ে যায়।

 

তবে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ধরা পড়ার ভয়ে সে ফোনটি নিজের কাছে না রেখে কাছাকাছি অন্য একটি ধানখেতের কাদাপানির মধ্যে লুকিয়ে রাখে। এরপর সে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কুমিল্লা জেলা ত্যাগ করে এবং আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সরাসরি বন্দরনগরী চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়।

 

এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক অধ্যায় লুকিয়ে আছে, যা সচেতন যেকোনো মানুষের বিবেককে নাড়া দেবে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে, ভয়াবহ বিপদের আঁচ পেয়ে তাজমিন তার বাবাকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছিল। রাত তখন দুইটা আটান্ন মিনিট।

 

আধুনিক মোবাইল প্রযুক্তির সহায়তায় সে তার বাবার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে নিজের বর্তমান অবস্থানের সরাসরি অবস্থান নির্দেশক বার্তা বা লাইভ লোকেশন পাঠায় এবং তাকে দ্রুত সেখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি বার্তা দেয়।

 

কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, সেই গভীর রাতে বাবা আব্দুল আলিম সারাদিনের ক্লান্তিতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। ফলে মেয়ের পাঠানো সেই জীবনরক্ষাকারী শেষ বার্তাটি তার আর তাৎক্ষণিকভাবে দেখা হয়নি। পরদিন সকালে যখন তিনি বার্তাটি দেখতে পান, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ততক্ষণে তার আদরের সন্তান পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছে।

 

পরদিন, অর্থাৎ আট অক্টোবর, বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ওই নির্জন ধানখেত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মর্মান্তিক এই দৃশ্য দেখে স্থানীয় জনমনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

 

পরবর্তীতে পুলিশ প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে মরদেহটি নিখোঁজ জান্নাতুল তাজমিনের বলে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। ঘটনাস্থলে নিবিড় তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ উল্টে পড়ে থাকা সেই সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি জব্দ করে, যা এই মামলার তদন্তে সবচেয়ে বড় সূত্র হিসেবে কাজ করেছে।

 

এই ঘটনার পরপরই শোকাহত ও বাকরুদ্ধ পিতা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে ন্যায়বিচারের আশায় লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর থেকেই পুলিশ অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে মাঠে নামে।

 

তদন্তের শুরুতেই পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে জব্দকৃত সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির ইঞ্জিন নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংগ্রহ করে। সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় গাড়ির মালিকানার সূত্র ধরে চালকের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

 

এরপর আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে ঘাতক সুমনের অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা হয়। কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি অত্যন্ত চৌকস দল চট্টগ্রাম নগরীর একটি গোপন আস্তানায় শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান পরিচালনা করে। সুপরিকল্পিত এই অভিযানের মাধ্যমে গোয়েন্দা পুলিশ মূল অভিযুক্ত সুমনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

 

শনিবার সকালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া সাংবাদিকদের সামনে তদন্তের এই সাফল্য এবং অভিযানের আদ্যোপান্ত বর্ণনা দেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত ঘাতক সুমন পুলিশের কাছে এই জঘন্য ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের কথা সম্পূর্ণভাবে স্বীকার করেছে।

 

সে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করেছে কীভাবে সে এই নির্মম ঘটনা ঘটিয়েছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করা হবে এবং সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করবে কি না, তা সেখানে উপস্থাপনের পরই পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে।

 

গুরুত্বপূর্ণ এই সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন লালমাই থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক পবিত্র সরকার এবং উপপরিদর্শক অর্ণবসহ একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

 

একটি ফুটফুটে কিশোরীর এমন নির্মম পরিণতি সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পুনরায় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এবং সাধারণ মানুষ এই জঘন্য অপরাধের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।