কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলের সমস্ত গঠনমূলক আশাবাদকে এক নিমিষে চরম হতাশায় রূপ দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই বহুল প্রতীক্ষিত প্রস্তাবটি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। একটি শীর্ষস্থানীয় মার্কিন সংবাদমাধ্যমের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন থেকে এই গভীর উদ্বেগজনক তথ্যটি প্রকাশ্যে এসেছে।
বিশ্বনেতারা এবং শান্তিকামী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন এই ভয়াবহ সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ, রক্তপাতহীন ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছেন, ঠিক সেই স্পর্শকাতর মুহূর্তে ওয়াশিংটনের এই চরম অনমনীয় ও যুদ্ধংদেহী অবস্থান পুরো বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত প্রভাবশালী, প্রথম সারির ও স্বনামধন্য গণমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাদের একটি বিশদ ও চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও প্রশাসনিক দপ্তর হোয়াইট হাউসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেবল ইরানের পাঠানো নতুন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবটি বাতিল করেই ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত ও ভয়াবহ করার এক ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ইতিমধ্যে তাঁর শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সামরিক নীতিনির্ধারক ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের এই মর্মে অত্যন্ত কঠোরভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আগামী নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য কংগ্রেস নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরপরই তিনি ইরানের ওপর পুনরায় ব্যাপক ও সর্বাত্মক মাত্রায় বোমাবর্ষণের নির্দেশ প্রদান করবেন।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া এবং আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় তিনি সাময়িকভাবে এই সামরিক আক্রমণ স্থগিত রাখলেও, নির্বাচনের পর তিনি আরও অনেক বেশি কঠোর, আগ্রাসী ও নির্দয় সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে মনে করছেন।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো একটি বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে এবং কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এই প্রতিবেদনের বস্তুনিষ্ঠতা, সত্যতা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট তথ্য জানার জন্য হোয়াইট হাউসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে।
কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়কর, রহস্যজনক ও ইঙ্গিতপূর্ণভাবে হোয়াইট হাউসের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাই এই স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি। মার্কিন প্রশাসনের এই পরিকল্পিত ও সুকৌশলী নীরবতা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মনে এই আশঙ্কাই আরও জোরালো করেছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসলেই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে একটি সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযানের ছক কষছেন এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথটি এই মুহূর্তে মার্কিন প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকায় একেবারেই নেই।
এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই চরম অনমনীয়, আগ্রাসী ও সামরিক সমাধানের দিকে ঝুঁকে থাকার ঠিক বিপরীত একটি ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে ইরানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায়। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জনাকীর্ণ ও বহুল আলোচিত সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে তেহরানের বর্তমান অবস্থান অত্যন্ত সুষ্পষ্ট ও সাবলীলভাবে তুলে ধরেন।
তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববাসীকে জানান যে, অত্যন্ত বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের সার্বিক সহযোগিতা ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ওয়াশিংটনের কাছে একটি নতুন, বিস্তারিত, যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত শান্তি চুক্তির নথিপত্র পাঠিয়েছে তেহরান।
উল্লেখ্য, কাতার দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জটিল রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সংঘাতে অত্যন্ত সফল, নিরপেক্ষ ও বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শান্তি উদ্যোগেও দোহার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও গঠনমূলক।
জাতিসংঘের ওই সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি তাদের পাঠানো চুক্তির শর্তগুলো সদিচ্ছার সঙ্গে মেনে নিতে এবং একটি স্থায়ী ও অর্থবহ যুদ্ধবিরতিতে রাজি থাকেন, তবে তেহরান তার কূটনৈতিক সদিচ্ছার সর্বোচ্চ প্রমাণস্বরূপ আগামী মাত্র সাত দিনের মধ্যে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণভাবে খুলে দেবে।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত এই হরমুজ প্রণালি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও অতি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। বিশ্বের মোট সামুদ্রিক জ্বালানি তেলের এক বিশাল অংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
এই প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে যে তীব্র অস্থিরতা, মূল্যবৃদ্ধি ও সীমাহীন অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে ইরানের এই প্রস্তাবটি একটি যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হতে পারত। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের অনীহা ও জেদ বজায় থাকার কারণে সেই অবারিত সম্ভাবনা বর্তমানে চরম হুমকির মুখে পতিত হয়েছে।
নতুন এই শান্তি চুক্তির নথিতে ঠিক কী ধরনের শর্তাবলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এর ভিত্তি কী, সে বিষয়েও সংবাদ সম্মেলনে সুস্পষ্ট ও বিশদ ধারণা প্রদান করেন ইরানের অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি।
তিনি বিস্তারিতভাবে জানান যে, গত জুন মাসে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ও গঠনমূলক আলোচনার পর যে ঐতিহাসিক ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, মূলত সেই স্মারকে উল্লিখিত ও উভয় পক্ষের পূর্বসম্মত শর্তগুলোকেই এই নতুন চুক্তির নথিতে অত্যন্ত সুচারুভাবে ও অপরিবর্তিত অবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এর সহজ অর্থ হলো, ইরান নতুন করে কোনো অন্যায্য, অযৌক্তিক বা অসম্ভব শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেনি, বরং পূর্বের সমঝোতার ভিত্তিতেই তারা একটি শান্তিপূর্ণ, টেকসই ও সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছাতে অত্যন্ত আগ্রহী।
এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, তেহরান এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতকে আরও প্রলম্বিত করার চেয়ে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমস্যার একটি দ্রুত ও স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে অনেক বেশি আন্তরিক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
নিজের বক্তব্যের সপক্ষে অত্যন্ত জোরালো যুক্তি তুলে ধরে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছার চরম অভাবকে সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে আরাগচি অত্যন্ত প্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, “আমাদের দিক থেকে সবকিছুই সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত আছে।
আমরা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় সকল ছাড় ও পদক্ষেপ ইতিমধ্যে গ্রহণ করেছি। এখন আমরা শুধু চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ন্যূনতম আন্তরিকতা ও বাস্তবসম্মত সদিচ্ছার অপেক্ষা করছি।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, শান্তি প্রতিষ্ঠার বল এখন সম্পূর্ণরূপে ওয়াশিংটনের কোর্টে অবস্থান করছে। কিন্তু হোয়াইট হাউসের বর্তমান যুদ্ধংদেহী মনোভাব, পেশিশক্তির আস্ফালন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কৌশল এই উজ্জ্বল কূটনৈতিক সম্ভাবনাকে এক অন্ধকার ও অনিশ্চিত সুড়ঙ্গের দিকে প্রবল বেগে ঠেলে দিচ্ছে।
সার্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বর্তমান ঘটনাবলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই চলমান ও ক্রমবর্ধমান সংকট কেবল এই দুটি দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই আর আবদ্ধ নেই, বরং এটি সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি সত্যিই তাঁর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী নভেম্বর মাসের কংগ্রেস নির্বাচনের পর ইরানের ওপর নতুন করে বিধ্বংসী বোমাবর্ষণের নির্দেশ প্রদান করেন, তবে তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক সর্বাত্মক, দীর্ঘমেয়াদী ও নিয়ন্ত্রণহীন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে।
সেই সম্ভাব্য যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ও ধ্বংসাত্মক নেতিবাচক প্রভাব থেকে বিশ্বের কোনো দেশই নিজেদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে অক্ষত রাখতে পারবে না। জাতিসংঘসহ গোটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং শান্তিকামী বিশ্ববাসী এখন চরম উৎকণ্ঠা, গভীর শঙ্কা ও রুদ্ধশ্বাস উদ্বেগের সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্তের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সবার মনে এখন একটাই ভয়াবহ প্রশ্ন প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত কি মানবতা, কূটনীতি ও শান্তির জয় হবে, নাকি বিশ্বকে আবারও পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার দম্ভে এক ভয়াবহ ও মানবসৃষ্ট সামরিক ধ্বংসযজ্ঞের চাক্ষুষ সাক্ষী হতে হবে।