সোমবার, অক্টোবর ৫, ২০২৬
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অক্ষত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘ যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিল ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৯ এএম

অক্ষত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘ যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিল ইরান
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পশ্চিমা বিশ্বের অব্যাহত অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও জোরালো বার্তা প্রদান করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে তেহরান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, তাদের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও সমরাস্ত্র উৎপাদনের সরবরাহব্যবস্থা সম্পূর্ণ অক্ষত ও পুরোদমে সচল রয়েছে।

 

শুধু তা-ই নয়, উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় যতদিন প্রয়োজন, ঠিক ততদিনই নিরবচ্ছিন্নভাবে সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা তাদের রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই অনমনীয় অবস্থান পশ্চিমা বিশ্বের জন্য একটি স্পষ্ট সংকেত যে, সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের ক্ষেত্রে তারা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে এবং কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপ বা অবরোধ তাদের এই নিরবচ্ছিন্ন সামরিক অগ্রগতিকে অবরুদ্ধ করতে পারবে না।

 

ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ বা আইআরজিসি-এর অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডারের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী বালালি গত শনিবার (৩ অক্টোবর) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দাবিগুলো তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, জাতীয় প্রতিরক্ষার স্বার্থে যেকোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত মোকাবিলা করার জন্য তেহরান মানসিকভাবে, কৌশলগতভাবে এবং সমরাস্ত্রের মজুতের দিক থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

 

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ এবং দূরপাল্লার নির্ভুল হামলার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই প্রেক্ষাপটে আইআরজিসি-এর এই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার এমন বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ইরান তাদের সমরাস্ত্রের ভাণ্ডার এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার নিরবচ্ছিন্ন ধারা বজায় রাখার বিষয়ে চরম আত্মবিশ্বাসী।

 

তিনি জানান যে, দেশের অভ্যন্তরীণ সামরিক অবকাঠামো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতেও রসদ ও অস্ত্রের বিন্দুমাত্র ঘাটতি হতে দেবে না। সমরাস্ত্র, বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে নিজেদের অভাবনীয় সফলতার কথা তুলে ধরে জেনারেল বালালি জোর দিয়ে বলেন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো খাত বা কাঁচামাল নিয়েই বর্তমানে ইরানের সামরিক নেতৃত্বের কোনো উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা নেই।

 

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করার জন্য যত ধরনের সূক্ষ্ম উপাদান, প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম এবং কাঁচামালের প্রয়োজন হয়, তার প্রতিটি অংশ এখন সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে ইরানের অভ্যন্তরেই অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে উৎপাদিত হচ্ছে।

 

সামরিক স্বনির্ভরতার এই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর কারণে তেহরান এখন আর সমরাস্ত্রের জন্য বহির্বিশ্বের কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। শুধু নিজেদের অভ্যন্তরীণ সামরিক চাহিদাই নয়, বরং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর কাছে প্রয়োজনে এসব উন্নত প্রযুক্তির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি করার মতো বিপুল সক্ষমতাও ইরান ইতোমধ্যে অর্জন করেছে বলে তিনি দাবি করেন।

 

পশ্চিমা বিশ্বের দশকব্যাপী কঠোর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে দাঁড়িয়ে ইরানের এই অভাবনীয় সামরিক স্বনির্ভরতা অর্জন আন্তর্জাতিক সমর বিশেষজ্ঞদের কাছেও বর্তমানে একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

সামরিক প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্রের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইরানের বর্তমান কৌশলগত দর্শনের একটি পরিষ্কার চিত্রও উঠে এসেছে জেনারেল বালালির এই সময়োপযোগী বক্তব্যে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ক্রমাগত উন্নয়ন, আধুনিকীকরণ, নকশা প্রণয়ন এবং নতুনত্ব আনার ক্ষেত্রে তেহরান সম্পূর্ণভাবে নিজেদের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সামরিক অভিযানের সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তার ওপর নির্ভর করে।

 

প্রতিটি সামরিক অভিযানের ধরন, কৌশলগত লক্ষ্য এবং সম্ভাব্য শত্রুর হুমকির কথা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনায় রেখে ইরান তাদের নিজস্ব প্রকৌশলী ও সামরিক বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে নিত্যনতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটাচ্ছে।

 

এই খাতে দেশটি এতটা নিখুঁত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করেছে যে, প্রাথমিক নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত উৎপাদন পর্যন্ত কোনো স্তরেই এখন আর বিদেশি প্রকৌশলী বা প্রযুক্তিগত সহায়তার ছিটেফোঁটাও প্রয়োজন হয় না।

 

তাদের এই নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী ও ভয়ংকর একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা যেকোনো আগ্রাসন রুখে দিতে সক্ষম।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সংঘাতের এই জটিল সমীকরণে ইরানের এই দৃঢ় অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষ করে এমন একটি সময়ে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের সামরিক সরবরাহব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য তাদের অর্থনৈতিক ও আইনি অবরোধের জাল আরও বিস্তৃত করেছে।

 

উল্লেখ্য, গত ২৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর (ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট) ইরানের অস্ত্র ও অস্ত্রের উপাদান সংগ্রহের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার লক্ষ্যে নতুন করে একগুচ্ছ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

 

এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত অন্তত দশজন ব্যক্তি ও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, যাদের বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক বাহিনীর জন্য সংবেদনশীল সমরাস্ত্রের উপাদান ও প্রযুক্তি সংগ্রহে গোপনে সহায়তা করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছিল ওয়াশিংটন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য ছিল বহির্বিশ্বের সরবরাহ লাইনগুলো সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কর্মসূচিকে দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত করা।

 

কিন্তু ওয়াশিংটনের সেই পদক্ষেপের মাত্র কয়েক দিনের মাথাতেই ইরানি সামরিক কর্মকর্তার এই প্রকাশ্য দম্ভোক্তি প্রমাণ করে যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তেহরানের মূল সমরাস্ত্র উৎপাদন কাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থায় কোনো দৃশ্যমান ফাটল ধরানো সম্ভব হয়নি।

 

জেনারেল বালালি সুস্পষ্টভাবে দাবি করেছেন যে, পশ্চিমাদের এই ধরনের বহুমুখী রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ ও গোয়েন্দা নজরদারির মাঝেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহের পথ এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে সচল, নিরাপদ ও বাধাহীন রয়েছে।

 

এটি জোরালোভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটানোর জন্য একটি অত্যন্ত জটিল, নিশ্ছিদ্র এবং বিকল্প সরবরাহ চেইন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা সহজে ধ্বংস করা পশ্চিমা শক্তির পক্ষেও প্রায় অসম্ভব।

 

ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন ইরানের এই বর্ধিত সামরিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির বিষয়টি সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সামরিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন যে, বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় ইরানের এই ধরনের ঘোষণা মনস্তাত্ত্বিক লড়াই বা 'সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার'-এরও একটি বড় অংশ হতে পারে।

 

যেকোনো সামরিক সংঘাতে বা উত্তেজনার মুহূর্তে নিজেদের দেশের আপামর জনসাধারণের মনোবল চাঙ্গা রাখা এবং সম্ভাব্য শত্রুপক্ষকে একটি শক্তিশালী ও ভীতিকর বার্তা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই এ ধরনের কৌশলগত পরাক্রমের বয়ান তৈরি করে থাকে। ইরানের তরফ থেকে এর আগেও নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার দাবি একাধিকবার করা হয়েছে।

 

তবে, তাদের বিশাল সমরাস্ত্রের ভাণ্ডার বা উৎপাদন অবকাঠামোর প্রকৃত অবস্থা, এর প্রকৃত পরিসর এবং পশ্চিমাদের সাইবার বা অন্যান্য হামলায় এসব সুরক্ষিত অবকাঠামোর কোনো অভ্যন্তরীণ ক্ষয়ক্ষতি বাস্তবে হয়েছে কি না, তার কোনো নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান কখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না।

 

সামরিক গোপনীয়তার দুর্ভেদ্য চাদরে মোড়ানো এই প্রতিরক্ষা শিল্পটি ঠিক কতটা সুরক্ষিত বা ক্ষতিমুক্ত, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করার কোনো সরাসরি সুযোগ আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নেই। সার্বিক বিবেচনায়, ইরানের এই সাম্প্রতিক ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল, স্পর্শকাতর ও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

 

একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক হুমকির মাধ্যমে ইরানের সামরিক ডানা ছেঁটে ফেলার জন্য, অন্যদিকে ইরান নিজেদের সম্পূর্ণ অজেয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রমাণের মাধ্যমে যেকোনো বিদেশি আগ্রাসনের কঠোর ও ধ্বংসাত্মক জবাব দেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত থাকার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করছে।

 

দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য তেহরানের এই সুস্পষ্ট প্রস্তুতি এবং নিজস্ব প্রযুক্তিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে সমরাস্ত্র উৎপাদনের প্রমাণিত সক্ষমতা-এই দুইয়ের সংমিশ্রণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে।

 

আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি যেদিকেই মোড় নিক না কেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় ইরানের এই নিজস্ব সমরাস্ত্র শিল্প যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অকাট্য ও নির্ধারক প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।